খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ৬:২৩ পিএম
“সত্যের পক্ষে কলম ধরা শুধু পেশা নয়—এ এক ধরনের দায়বদ্ধতা।”
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে গোলাম সারওয়ার এক উজ্জ্বল, প্রজ্ঞাবান ও শ্রদ্ধেয় নাম। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি শুধু সংবাদকর্মী ছিলেন না—ছিলেন একজন দক্ষ সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক এবং গণমাধ্যমের অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর ক্ষুরধার কলমে যেমন উঠে এসেছে সময়ের সত্য, তেমনি তাঁর সম্পাদনায় সংবাদপত্র পেয়েছে নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন মাত্রা।
গোলাম সারওয়ারের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল, বরিশালের বানারীপাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে।
১৯৬৩ সালে দৈনিক পয়গমে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। এরপর তিনি কাজ করেছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকাল-এ। বিশেষ করে সম্পাদনা ও সংবাদপত্র পরিচালনায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে দেশের সাংবাদিক মহলে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি ছিলেন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক সংবাদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হন। স্বাধীনতার পর কিছুদিন বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনে প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবন ও সাধনার প্রধান ক্ষেত্র।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও মননশীল লেখালেখিতেও তিনি রেখেছেন স্মরণীয় অবদান। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রঙিন বেলুন’, ‘সম্পাদকের জবানবন্দি’, ‘অমিয় গরল’, ‘আমার যত কথা’ ও ‘স্বপ্ন বেঁচে থাক’। তাঁর লেখায় ছিল নির্মোহ বিশ্লেষণ, ভাষার সৌন্দর্য, রসবোধ এবং সমাজ ও সময়কে গভীরভাবে দেখার এক অনন্য ক্ষমতা।
দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের বিকাশে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া ২০১৬ সালে কালচারাল জার্নালিস্টস ফোরাম অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি) আজীবন সম্মাননা এবং ২০১৭ সালে আতাউস সামাদ স্মারক ট্রাস্ট আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।
তিনি সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেন্সর বোর্ডের আপিল বিভাগের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান।
তাঁর জীবন ছিল সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক দীর্ঘ অধ্যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন—একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কলম, আর সেই কলমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা।
২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাম সারওয়ার মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর চলে যাওয়া ছিল বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের জন্য এক গভীর শূন্যতা। কিন্তু মানুষ চলে যায়, তাঁর কর্ম থেকে যায়; কণ্ঠ স্তব্ধ হয়, কিন্তু সত্যের পক্ষে লেখা শব্দগুলো থেকে যায় যুগের পর যুগ।
আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই বরেণ্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখককে।
গোলাম সারওয়ার নেই—কিন্তু তাঁর কলমের আলো, তাঁর সাংবাদিকতার আদর্শ এবং তাঁর রেখে যাওয়া কর্মের দীপ্তি আজও বাংলাদেশের সংবাদজগতকে আলোকিত করে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আপনার কলমের আলো বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
মন্তব্য