খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে মাঘ ১৪৩২ | ২৮ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
অগ্নিযুগের বিপ্লবী
পুলিনবিহারী দাস
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে অগ্নিযুগের সূর্যসন্তানরা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিলেন, পুলিনবিহারী দাস ছিলেন তাঁদের অন্যতম অগ্রদূত। তিনি শুধু একজন বিপ্লবী নন—তিনি ছিলেন সংগঠক, প্রশিক্ষক, সাহসের প্রতীক এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা।
পুলিনবিহারী দাসের জন্ম ১৮৭৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার লনসিং গ্রামে, এক শিক্ষিত ও সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে। পারিবারিকভাবে জমিজমা থাকলেও তাঁদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সবাই ছিলেন চাকরিজীবী।
তাঁর পিতা নবকুমার দাস মাদারিপুর মহকুমার সাব-ডিভিশনাল কোর্টের উকিল ছিলেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও মুন্সেফ—আইন ও প্রশাসনের সঙ্গে যাঁদের নিবিড় সম্পর্ক।
১৮৯৪ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ছাত্রজীবনেই তাঁর মেধা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়—কলেজের গবেষণাগারে তিনি ব্যবহারিক শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শৈশব থেকেই শরীরচর্চার প্রতি পুলিনবিহারীর ছিল প্রবল আকর্ষণ। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ লাঠিয়াল। কলকাতায় সরলা দেবীর আখড়া দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯০৩ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে একটি নিজস্ব আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯০৫ সালে বিখ্যাত লাঠিয়াল মুর্তাজার কাছে তিনি লাঠিখেলা ও অসিক্রীড়ার কৌশল আয়ত্ত করেন—যা পরবর্তীকালে বিপ্লবী প্রশিক্ষণের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ববঙ্গ ও আসামে বিপিন চন্দ্র পাল ও প্রমথ নাথ মিত্রের সফর পুলিনবিহারীর জীবনে এক ঐতিহাসিক মোড় এনে দেয়। প্রমথ নাথ মিত্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিদেশি শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার সংকল্প নেন তিনি।
সে বছরের অক্টোবর মাসে, ঢাকায় ৮০ জন তরুণকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অনুশীলন সমিতি—যা অচিরেই বিপ্লবী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার ফলে পূর্ববঙ্গ ও আসামজুড়ে অনুশীলন সমিতির পাঁচ শতাধিক শাখা গড়ে ওঠে।
তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যাশনাল স্কুল’—নামে স্কুল হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
প্রথমে লাঠিখেলা ও কাঠের তলোয়ার, পরে ছোরা, এবং সর্বশেষ পিস্তল ও রিভলভারের মাধ্যমে বিপ্লবীদের প্রস্তুত করা হতো স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য।
ঢাকার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বাসিল কপ্লেস্টন অ্যালেনকে অপসারণের এক দুঃসাহসী পরিকল্পনার নেপথ্যেও ছিলেন পুলিনবিহারী।
১৯০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর, গোয়ালন্দ স্টেশনে অ্যালেনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়—অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এর কিছুদিন পর প্রায় চারশো দাঙ্গাবাজ হিন্দু-বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে পুলিনবিহারীর বাড়িতে হামলা চালালে তিনি অল্প কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে অসীম সাহসিকতায় তাদের প্রতিরোধ করেন।
১৯০৮ সালের শুরুতে, অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি বিপ্লবীদের নিয়ে ঢাকার নবাবগঞ্জের বরার জমিদার বাড়িতে দিনের আলোয় এক রোমাঞ্চকর ডাকাতি সংগঠিত করেন। লুণ্ঠিত অর্থ ব্যয় করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহে।
সে বছরই ভূপেশ চন্দ্র নাগ, শ্যাম সুন্দর চক্রবর্তী, কৃষ্ণ কুমার মিত্র, সুবোধ মল্লিক ও অশ্বিনী দত্তসহ তিনি গ্রেপ্তার হন এবং নিক্ষিপ্ত হন মন্টোগোমারি কারাগারে।
অমানুষিক নির্যাতনও তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে দমাতে পারেনি।
১৯১০ সালে মুক্তির পর তিনি আবার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এই সময় অনুশীলন সমিতির ঢাকা শাখা কলকাতার দল পরিচালনা করে। তবে প্রমথ নাথ মিত্রের মৃত্যুর পর দুই শাখা আলাদা হয়ে যায়।
১৯১০ সালের জুলাই মাসে, ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায় ৪৬ জন বিপ্লবীসহ পুলিনবিহারী দাস গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে আরও ৪৪ জন গ্রেপ্তার করা হয়।
বিচারে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় এবং তাঁকে পাঠানো হয় সেলুলার জেলে—যেখানে তিনি হেমচন্দ্র দাস, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতো কিংবদন্তি বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে আসেন।
১৯১৮ সালে তাঁর সাজা কিছুটা লাঘব হয় এবং তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়।
১৯১৯ সালে তিনি সম্পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন।
দীর্ঘ সংগ্রামময় জীবনের অবসান ঘটে ১৭ আগস্ট ১৯৪৯ সালে।
পুলিনবিহারী দাস ইতিহাসের পাতায় শুধু একটি নাম নন—তিনি সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগঠনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অগ্নিযুগের এই বিপ্লবীর স্মৃতি চির অম্লান।