চামড়ার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং কোরবানির মৌসুমে সরকারি দামের অকার্যকারিতা

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশজুড়ে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কেনাবেচা শুরু হলেও বরাবরের মতোই সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রতি বছরের মতো এবারও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে লবণযুক্ত চামড়ার একটি নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দিয়েছিল। তবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পশুর চামড়ার প্রধান প্রধান আড়ত ও বাণিজ্যিক বাজারগুলোতে এই নির্ধারিত মূল্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গত বছরের তুলনায় অনেক কম মূল্যে কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, যা এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সংকটকে পুনরায় সামনে এনেছে।

সরকার নির্ধারিত মূল্য এবং বাজারের বাস্তব চিত্র

চলতি বছরের ১৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে চামড়া খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা বিগত বছরের তুলনায় বর্গফুট প্রতি মাত্র ২ টাকা বেশি। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, পশুর আকার ভেদে চামড়ার আয়তন ভিন্ন হয়। বড় আকারের গরুর চামড়া সাধারণত ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের চামড়া ২১ থেকে ৩০ বর্গফুট এবং ছোট আকারের চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়ে থাকে।

প্রক্রিয়াজাতকরণ বা লবণ দেওয়া এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ চামড়া প্রতি গড়ে ৩৫০ টাকা খরচ বিবেচনা করলে কাঁচা চামড়ার একটি যৌক্তিক মূল্য পাওয়ার কথা ছিল। তবে ঈদের দিন রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর টাউন হল, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং लालবাগের পোস্তা এলাকায় সরেজমিনে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ছোট আকারের কাঁচা চামড়া যেখানে ৬さと থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, সেখানে তা বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। একইভাবে মাঝারি ও বড় আকারের চামড়াও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে কেনাবেচা হয়েছে। অন্যদিকে, ছাগলের চামড়ার প্রতি বরাবরের মতোই ব্যবসায়ীদের চরম অনীহা দেখা গেছে, যা প্রতিটি মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে কোরবানির গরুর চামড়ার সরকারি সম্ভাব্য মূল্য এবং ঢাকার বাজারে প্রকৃত বিক্রয় মূল্যের একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:

চামড়ার আকার ও ধরন সরকারি হিসাব অনুযায়ী সম্ভাব্য মূল্য (টাকা) ঢাকার বাজারে প্রকৃত বিক্রয় মূল্য (টাকা) গত বছরের তুলনায় মূল্যের ব্যবধান
ছোট আকারের চামড়া ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা প্রতিটি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম
মাঝারি আকারের চামড়া ৯৫০ থেকে ১,৫০০ টাকা ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা গত বছর ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা
বড় আকারের চামড়া ১,৫৫ো থেকে ২,৩০০ টাকা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কম
ছাগলের চামড়া (নির্দিষ্ট তথ্য নেই) ৫ থেকে ১০ টাকা বিগত কয়েক বছরের মতোই নামমাত্র মূল্য

ব্যবসায়ী ও নীতি নির্ধারকদের পারস্পরিক দাবি

চামড়ার এই মূল্য পতনের পেছনে আড়তদার, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং ট্যানারি মালিকদের মধ্যে পারস্পরিক ভিন্ন দাবি দেখা গেছে। ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকরা আন্তর্জাতিক বাজারে রাসায়নিক দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধি এবং জুতো বা অন্যান্য সামগ্রী উৎপাদনের খরচ বাড়ার অজুহাতে কাঁচা চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন। পোস্তা এলাকার বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. টিপু সুলতান এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ অবশ্য দাবি করেছেন যে, চামড়ার বাজার স্বাভাবিক রয়েছে এবং তারা নির্ধারিত নিয়মের মধ্যেই কেনাবেচা করছেন। অন্যদিকে, বাণিজ্য সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান জানিয়েছেন, কোরবানির পরপরই চামড়ায় লবণ না দেওয়ার কারণে কাঁচা চামড়ার দাম কিছুটা কম হলেও পরবর্তীতে লবণযুক্ত চামড়া সরকারি দামেই বিক্রি হবে।

চামড়া শিল্পের মূল সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

বাণিজ্যিক তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৯ কোটি মার্কিন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। দেশের বাইরে রপ্তানি আয় বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরে কাঁচা চামড়ার দাম না বাড়ার মূল কারণ সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়াশিল্প নগরীর পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার দীর্ঘ ২১ বছরেও সম্পূর্ণ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে ধলেশ্বরী নদী মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।

পরিবেশগত আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চামড়া কিনছে না। ফলে বাংলাদেশি চামড়ার বাজার এখন মূলত চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করছে, যারা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিড-এর নির্বাহী পরিচালক মো. আবু ইউসুফ বলেন, মাত্র দুই বছরের একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সংস্কার করে যদি আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ নেওয়া যায়, তবে এই খাত থেকে ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব হবে এবং দেশীয় বাজারেও কাঁচা চামড়ার সঠিক মূল্য নিশ্চিত হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।