খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪৯ পিএম
ক্রিকেটে জীবন পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কখনো ফিল্ডারের হাত ফসকে যায়, কখনো ক্যাচের সুযোগ তৈরি হয় না, আবার কখনো প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত বদলে দেয় পুরো পরিস্থিতি। ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে স্টিভেন স্মিথের ক্ষেত্রেও ঘটল তেমনই কিছু। একাধিকবার আউটের কাছাকাছি গিয়েও বেঁচে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, প্রযুক্তিই তাঁকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে স্মিথের শুরুটা মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিল না। মাত্র ২ রানে থাকতেই তানজিদ হাসানের হাতে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তিনি। এরপর আরেকটি সুযোগ তৈরি হলেও তৃতীয় স্লিপে কোনো ফিল্ডার না থাকায় রক্ষা পান অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পরও স্মিথ ক্রিজে টিকে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত জীবনটি আসে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের ২১তম ওভারে। ইবাদত হোসেনের করা একটি বল স্মিথের ব্যাটের পাশ ঘেঁষে উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে জমা পড়ে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা সঙ্গে সঙ্গে জোরালো আবেদন করেন। কিন্তু মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা তাতে সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ দ্রুত রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় স্মিথও প্রায় ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিক্রিয়াতেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনিও পরিস্থিতিকে নিজের বিপক্ষে বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
রিপ্লেতে আলট্রাএজে কোনো স্পাইক বা স্পষ্ট শব্দতরঙ্গ পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে এবং স্মিথকে আর মাঠ ছাড়তে হয়নি। অথচ দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে স্মিথ জানান, তাঁর নিজেরও মনে হয়েছিল বলটি ব্যাটে লেগেছিল।
স্মিথ বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল বল ব্যাটে স্পর্শ করেছে। তবে ক্রিকেটে মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ব্যাটসম্যানের অনুভূতি এবং প্রযুক্তির ফল এক হয় না। তাঁর ভাষায়, তিনি যদি আউট দেওয়া হতো, তাহলে মাঠ ছেড়ে চলে যেতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির ফল তাঁকে রক্ষা করেছে বলেই মনে করছেন তিনি।
এই জীবন পাওয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শেষ পরিণতি দেখলে। হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। বাংলাদেশের ডানহাতি পেসার একাই নেন ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে স্মিথ ছাড়া আর কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
স্মিথের ৭১ রান তাই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শুরুতে একাধিকবার জীবন পাওয়ার পর তাঁর এই ইনিংস দলের মোট সংগ্রহকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করেছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ বা রিভিউয়ের মুহূর্তগুলোর কোনোটি বাংলাদেশের পক্ষে গেলে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর আরও কম হতে পারত—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে স্মিথ ব্যক্তিগতভাবে নিজের ভাগ্য নিয়ে বেশি কথা না বলে বাংলাদেশের বোলারদের প্রশংসাই করেছেন। তাঁর মতে, প্রথম দিন বাংলাদেশের সব বোলারই ভালো জায়গায় বল করেছেন। উইকেটে কিছুটা সিম মুভমেন্ট থাকায় ব্যাটসম্যানদের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। বাংলাদেশি বোলাররা ধারাবাহিকভাবে ভালো লেংথ বজায় রেখে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশও প্রথম দিনের শেষভাগে দারুণভাবে এগিয়েছে। ২৪ ওভার ব্যাট করে এক উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকরা তুলেছে ৯৬ রান। ফলে হাতে নয় উইকেট রেখে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০২ রান।
এই পরিস্থিতিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে পড়লেও স্মিথ মনে করছেন, অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় দিনে দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলতে পারলেই ম্যাচে ফেরার পথ তৈরি হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
স্মিথের বক্তব্যে তাই আত্মবিশ্বাসের সুরই ছিল। তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন এবং শুরুতেই কয়েকটি উইকেট পাওয়া গেলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব। ডারউইন টেস্টের প্রথম দিন বাংলাদেশের বোলিং যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, তেমনি স্মিথের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটিও হয়ে উঠেছে দিনের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
একদিকে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে আটকে দিয়েছে, অন্যদিকে স্মিথের একাধিক জীবন বাংলাদেশকে ভাবাচ্ছে—ক্রিকেটের অনিশ্চয়তার এমন দুই ভিন্ন চিত্রই ফুটে উঠেছে প্রথম দিনে। দ্বিতীয় দিনে কোন দল সেই সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই এখন টেস্টের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মন্তব্য