খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৮ পিএম
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাস লিখলেন পেসার হাসান মাহমুদ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট শিকার করে ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ের পাশাপাশি গড়েছেন বিরল এক কীর্তি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি পেসারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের রেকর্ড এখন তার দখলে।
এই পারফরম্যান্সের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, তিন সংস্করণ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের এক ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার ঘটনাও এবারই প্রথম। এর আগে টেস্টে মাশরাফি বিন মুর্তজার তিন উইকেট, ওয়ানডেতে রুবেল হোসেনের চার উইকেট এবং টি-টোয়েন্টিতে তাসকিন আহমেদের চার উইকেট ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলারদের সেরা সাফল্য। হাসান সেই সীমা পেরিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছেন।
অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার আগে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে বেশ পরিষ্কার ছিলেন হাসান। তিনি জানিয়েছিলেন, সফরে অন্তত দুবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। এমনকি একা থাকলেও সেই মুহূর্তের কল্পনা করতেন। ডারউইনের মাঠে প্রথম ইনিংসেই সেই স্বপ্নের একটি অংশ বাস্তবে রূপ পেল।
শুরু থেকেই হাসানের বোলিংয়ে ছিল নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন। প্রথম ঘণ্টায় উইকেট না পেলেও তিনি জেক ওয়েদারাল্ডকে অফ স্টাম্পের বাইরে ধারাবাহিকভাবে বল করে চাপে রাখেন। শেষ পর্যন্ত সেই চাপের ফল আসে। প্রলুব্ধ হয়ে ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন ওয়েদারাল্ড। এরপর অতিরিক্ত বাউন্স ও মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে ট্রাভিস হেডকেও ফেরান হাসান। নিজের প্রথম স্পেলেই দুই উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ধাক্কা দেন তিনি।
বাংলাদেশের অন্য বোলাররাও তখন চাপ ধরে রাখেন। তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে স্বস্তি পেতে দেননি। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর আবার আক্রমণে ফেরেন হাসান। এবার তার শিকার প্যাট কামিন্স। উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক।
পরের ওভারেই আসে আরেকটি সাফল্য। মিচেল স্টার্ককে একইভাবে ক্যাচ বানিয়ে ইনিংসে চার উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। তবে তখনও তার সেরা মুহূর্ত বাকি ছিল।
চা-বিরতির পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুতই হাসানকে আক্রমণে ফেরান। দায়িত্ব পেয়েই কাজের কাজটি করেন এই পেসার। বাউন্সার পুল করতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন স্টিভ স্মিথ। সেই উইকেটের সঙ্গে পূর্ণ হয় হাসানের পাঁচ উইকেট। এরপর অস্ট্রেলিয়ার শেষ ব্যাটসম্যান ন্যাথান লায়নকে নিজের বলে ক্যাচ বানিয়ে ইনিংসে ছয় উইকেট পূর্ণ করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের বোলিং ইতিহাসে এই পারফরম্যান্সের গুরুত্ব তাই আলাদা। একই সঙ্গে এটি হাসানের টেস্ট ক্যারিয়ারেও একটি বড় মাইলফলক। এখন পর্যন্ত টেস্টে তিনবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তিনটি কীর্তিই এসেছে দেশের বাইরে। ২০২৪ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে এবং পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পর ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটেও এমন সাফল্য পেয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশি পেসারদের মধ্যে দেশের বাইরে টেস্টে তিনবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তিও এখন হাসানের। তার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, শুধু দেশের কন্ডিশনেই নয়, ভিন্ন পরিবেশেও নিজের বোলিং দক্ষতা কাজে লাগাতে তিনি ক্রমেই আরও পরিণত হয়ে উঠছেন।
ইনিংস বিরতিতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসান নিজের বোলিং পরিকল্পনার কথাও জানান। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় খেলার জন্য তিনি মুখিয়ে ছিলেন, কারণ দলটি বিশ্বের অন্যতম সেরা। নিজের বোলিংয়ে তিনি মূলত লাইন ও লেংথ ঠিক রাখার পাশাপাশি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখেছেন এবং অধিনায়কের নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন।
হাসান তার ব্যক্তিগত সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে চাননি। তার মতে, সতীর্থ বোলারদের ধারাবাহিক চাপই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে ভেঙে দিয়েছে। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চাপ ধরে রাখতে পেরেছিল বাংলাদেশ, আর সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই স্বাগতিকদের ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ডারউইনের এই ছয় উইকেট তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়। এটি বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতিরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়ার কঠিন কন্ডিশনে হাসানের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ, বাউন্স কাজে লাগানোর দক্ষতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশকে বড় সুবিধা এনে দিয়েছে।
সফরের আগে যে পাঁচ উইকেট নেওয়ার স্বপ্নের কথা হাসান বলেছিলেন, ডারউইনে সেটি ছাপিয়ে ছয় উইকেট দিয়ে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় তুলেছেন তিনি। এখন তার সামনে চ্যালেঞ্জ হবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা।
মন্তব্য