বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নজিরবিহীন এক ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিপুল অর্থ সহায়তা, ডলার লেনদেন জালিয়াতির অভিযোগ এবং পরবর্তীতে জরিমানা আংশিক মওকুফ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের সহায়তা গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ডলার-টাকা লেনদেন ঘিরে অনিয়মে রূপ নেয়।
অভ্যন্তরীণ নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ দফায় ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। এই অর্থ দেওয়া হয় ডলার ক্রয়ের বিনিময়ে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নস্ট্রো হিসাবে জমা না হওয়ায় আর্থিক অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
পরবর্তীতে ওই লেনদেনের জটিলতা এবং ডলার না পাওয়ার কারণে ইসলামী ব্যাংকের ওপর প্রায় ৩৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ জরিমানা আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে বিস্ময়করভাবে সেই জরিমানার অর্ধেক পরে মওকুফ করা হয়, যদিও ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন করা হয়নি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড অনুমোদনও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ লেনদেন ও জরিমানা পরিস্থিতি
নিচের সারণিতে ঘটনাপ্রবাহের প্রধান আর্থিক ধাপগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| সময়কাল | ঘটনা | পরিমাণ |
|---|---|---|
| ২০২৩ ডিসেম্বর–২০২৪ জুন | ডলার ক্রয়ের বিনিময়ে অর্থ সহায়তা | প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা |
| একই সময় | মোট ডলার ক্রয় চুক্তি | প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার |
| পরবর্তী পর্যায় | কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিমানা আরোপ | প্রায় ৩৭ কোটি টাকা |
| পরবর্তী সিদ্ধান্ত | জরিমানার ৫০ শতাংশ মওকুফ | প্রায় ১৮.৫ কোটি টাকা |
| অভ্যন্তরীণ হিসাব | গুড ভ্যালু নির্ধারণ | প্রায় ৩১–৩৭ কোটি টাকা |
অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। তৎকালীন নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে শুরু করে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় জরিমানা মওকুফের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডলার না দিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা গ্রহণের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গুরুতর অনিয়মের শামিল। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কারণে ট্রেজারি বিভাগে নেওয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে লেনদেন সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি তারা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং পরবর্তী সময়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি নিজেই নিয়ম ভেঙে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থার সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।



