দেশের ৪৪টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের নজিরবিহীন ও আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে ধারাবাহিক নীতিগত ছাড় ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের মোট ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অবনতি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কেবল দীর্ঘদিনের দুর্বল বা সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের আর্থিক দিক থেকে অত্যন্ত সুসংহত এবং শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত দি সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই তিন মাসে খেলাপি ঋণের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

তিন মাসে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিসংখ্যান

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের আক্রান্ত ৪৪টি ব্যাংকে যৌথভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে পুরো ব্যাংকিং খাতের দিকে تাকালে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যেখানে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা (যা মোট বিতরিত ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ), চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো পূর্ববর্তী ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য আড়াল বা কমিয়ে দেখানো হয়েছিল। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে সেইসব গোপন করা খেলাপি ঋণ উন্মোচিত হয় এবং ব্যাংকগুলোকে তথ্য সংশোধন করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়াও ঋণ আদায় পরিস্থিতিকে দুর্বল করেছে।

খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের চিত্র

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের এই ভয়াবহ চিত্র নিচে একটি সারণির মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো:

ব্যাংকের ধরন ও নাম তিন মাসে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি (কোটি টাকায়) মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণ (কোটি টাকায়) মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক (মোট ৪টি) ৩,৬৭৭ ১,৪৯,৭৮৫ ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ
জনতা ব্যাংক ২,২৫৮ ৭৫,০০০ ৭৪ শতাংশ
রূপালী ব্যাংক ৬৮৮ — —
অগ্রণী ব্যাংক ২৮৪ — —
বেসিক ব্যাংক লিমিটেড ১১ — —
বেসরকারি ব্যাংক (মোট ৪৩টি) ২৬,৯০৩ ৪,১৬,০০০ ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ
আইএফআইসি ব্যাংক ২৩,৪৯১ ২৮,১৭৪ ৬৩ শতাংশ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ৩,সিলিকন১৪ — —
এক্সিম ব্যাংক ৩,৩২০ — —
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২,৯৪২ — —
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড ২,১৬২ — —
প্রিমিয়ার ব্যাংক ১,৬৯৯ — —
এবি ব্যাংক ১,৩১৩ — —

শক্তিশালী ও অন্যান্য ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা

দেশের ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টি ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে তুলনামূলক ভালো মূলধন ও শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত ব্যাংকগুলোর তথ্য নিম্নরূপ:

  • ব্যাংক এশিয়া: বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৬২ কোটি টাকা।

  • দি সিটি ব্যাংক: বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২২ কোটি টাকা।

  • উত্তরা ব্যাংক: বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০৬ কোটি টাকা।

  • প্রাইম ব্যাংক: বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা।

  • স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ (বিদেশি): বৃদ্ধি পেয়েছে ২১৬ কোটি টাকা।

অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ৯১৭ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৭২৬ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকে ৪৫৩ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ২১৮ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ২১১ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১৯৩ কোটি টাকা, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৩১ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেডে ১৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৩৯৬ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১৯৯ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে ৩৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন (এইচএসবিসি) বাংলাদেশ এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।

ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্তাদের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই পরিস্থিতির বিষয়ে জানান, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে এবং এর ফলে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কিছু বড় ঋণগ্রহীতা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করে ক্রমাগত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তৌহিদুল আলম খান খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. কন্টার্ক তদারকি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে অতীতে গোপন রাখা খেলাপি ঋণ এখন প্রকাশ্যে আসছে।

২. বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ: ঋণ পরিশোধে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি স্থগিতাদেশ বা বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ব্যাংকগুলো চাপের মুখে থাকা হিসাবগুলোকে খেলাপি হিসেবে নতুন করে চিহ্নিত করতে বাধ্য হচ্ছে।

৩. অর্থনৈতিক চাপ: উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ঋণ নেওয়ার খরচ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য স্থবিরতার কারণে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

৪. সুশাসনের অভাব: ঋণ বিতরণের পূর্বে সঠিক ঋণ মূল্যায়ন এবং বন্ধকী সম্পত্তির সঠিক মূল্য নির্ধারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের চরম ঘাটতি রয়েছে।

৫. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে প্রভাবশালী গ্রাহকদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপি হওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।