চট্টগ্রামে শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ, ১০ কিমি যানজট

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরায় বাসচাপায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) এক ছাত্রী নিহত হওয়ার ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হওয়া এই অবরোধে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা পাশের রেললাইনেও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন।

নিহত শিক্ষার্থীর নাম মাইশা মুশফিরাত। তিনি আইআইইউসির ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় আরও তিন ছাত্রী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি লরির মধ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে চলাচলের একপর্যায়ে একটি লরি অন্যটিকে ধাক্কা দেয়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি লরি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মিনিবাসে আঘাত করে। ধাক্কায় মিনিবাসটি উল্টে গেলে সেটির নিচে চাপা পড়েন মাইশা।

দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজেও দুটি লরিকে দ্রুতগতিতে চলতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।

পথচারী-সেতুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

শিক্ষার্থী নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে নেমে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একটি পথচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফুল হক বলেন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পথচারী-সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো তাঁদের দাবির বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং নিরাপদ সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিতে তাঁরা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করেন। তাঁদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো থাকা জরুরি। ভারী যানবাহন চলাচলকারী ব্যস্ত মহাসড়কে এমন ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।

মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট

অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়ে। এতে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।

শিক্ষার্থীরা পাশের রেললাইনেও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করায় রেল চলাচলের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে রেল চলাচল বন্ধ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মহাসড়কটি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক যোগাযোগপথগুলোর একটি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়ে হয়। ফলে এ ধরনের অবরোধে স্থানীয় যাতায়াতের পাশাপাশি দূরপাল্লার পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।

লরি ও মিনিবাস থানায় নেওয়া হয়েছে

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন লরি দুটি আটক করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লরি দুটি ও মিনিবাসটি উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসে।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা মুনির চৌধুরী বলেন, সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আরেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি ঘটনাটি দেখভাল করছেন।

নিরাপদ সড়ক পারাপারের দাবি আবারও সামনে

মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপদ সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে। ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত পারাপারব্যবস্থা, সতর্কতামূলক সংকেত এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে ভারী যানবাহনের চলাচল বেশি এমন এলাকায় সড়ক পারাপারের ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পিত অবকাঠামো প্রয়োজন। তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, লরির চালকদের কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর সুযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-সম্প্রদায়ের জন্যও গভীর শোকের ঘটনা। শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে জনদুর্ভোগ তৈরি হলেও তাঁদের উত্থাপিত নিরাপত্তার দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।