মরদেহ নিয়ে থানা ঘেরাও করে স্থানীয়দের বিক্ষোভ প্রদর্শন

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায় ছিনতাইকারীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. জোবায়ের (১৮) নামের এক তরুণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, এই বর্বরোচিত ছুরিকাঘাতের ঘটনার পর বন্দর মডেল থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণে গড়িমসি এবং ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং ক্ষোভে ফেটে পড়ে নিহতের মরদেহ নিয়ে বন্দর মডেল থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন নিহতের পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় সর্বস্তরের ক্ষুব্ধ জনতা। রবিবার, ৭ জুন সন্ধ্যার দিকে জোবায়েরের মরদেহ ঢাকা থেকে বন্দর এলাকায় পৌঁছালে শতাধিক মানুষ সমবেত হয়ে থানার সামনে অবস্থান নেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

নিহত মো. জোবায়ের পাবনা সদর উপজেলার রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের ছেলে। তিনি নারায়ণগঞ্জের বন্দরের এনায়েতনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় সপরিবারে বসবাস করতেন এবং সেখানে একটি স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র ও নিহতের পারিবারিক বিবরণ থেকে জানা গেছে, গত বুধবার (৩ জুন) রাত ৯টার দিকে প্রতিদিনের মতো নিজের কর্মস্থলের কাজ শেষ করে পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন জোবায়ের। তিনি যখন এনায়েতনগরের ভাঙা ব্রিজের উত্তর পাশে পৌঁছান, ঠিক তখনই ওত পেতে থাকা তিন ছিনতাইকারী তাঁর পথরোধ করে দাঁড়ায়। জোবায়ের ছিনতাইকারীদের বাধা দিলে দুর্বৃত্তরা অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে শুরু করে। একপর্যায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে ছিনতাইকারীরা তাঁর কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় জোবায়েরকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে টানা কয়েক দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে রবিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জোবায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নিহতের পরিবার ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, গত বুধবার রাতে জোবায়ের ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হওয়ার পরপরই তাঁর বাবা জাহাঙ্গীর বন্দর মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু থানা পুলিশ সেই সময় বিষয়টি মোটেও আমলে নেয়নি এবং মামলাটি গ্রহণ করেনি। নিহতের প্রতিবেশী টিপু সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেন, থানায় মামলা নথিভুক্ত করার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। দরিদ্র ওই পরিবারটি দাবিকৃত ঘুষের টাকা দিতে না পারায় পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে তাঁদের ফিরিয়ে দেয়। রবিবার দুপুরে জোবায়েরের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এবং সন্ধ্যার দিকে তাঁর মরদেহ এলাকায় আনা হলে উত্তেজিত জনতা পুলিশের এই অমানবিক ও অপেশাদার ভূমিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা মরদেহবাহী গাড়ি নিয়ে সরাসরি বন্দর মডেল থানার সামনে উপস্থিত হন এবং থানা প্রাঙ্গণ ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভকারীরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মামলা গ্রহণে পুলিশের অনীহা ও ঘুষ দাবির সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন।

হত্যাকাণ্ড এবং ঘুষ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে থানা ঘেরাও ও বিক্ষোভের বিষয়ে বন্দর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, “এলাকাবাসী উত্তেজিত হয়ে মরদেহের কফিনসহ থানায় এসেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সাথে কথা বলে আশ্বস্ত করেছি যে, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাঁরা আমার এই প্রাতিষ্ঠানিক আশ্বাসের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে মরদেহ নিয়ে ফিরে গেছেন। এছাড়া, মামলা গ্রহণে গড়িমসি ও ঘুষ দাবির প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত সাব-ইন্সপেক্টরকে (এসআই) ইতিমধ্যে থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করে নিয়েছি।”

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরও যোগ করে বলেন, “ছিনতাইয়ের ঘটনার পর ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করতে এসে ফিরে গেছে বা তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো তথ্য দাপ্তরিকভাবে আমার কাছে পূর্বে ছিল না। তবে এই অপরাধের ঘটনাটি জানার পর জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যে একজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। যেহেতু জোবায়েরের পরিবারের পক্ষ থেকে পূর্বে কোনো নিয়মিত মামলা ছিল না, তাই গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অন্য একটি চলমান মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। এখন ভুক্তভোগীর পরিবার সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করলে, নতুন সেই মামলায় ওই আসামিকে শ্যোন অ্যারেস্ট (স্বীকৃত গ্রেপ্তার) দেখানো হবে। এর পাশাপাশি, এই বর্বরোচিত ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অন্য আসামিদের নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে এবং তাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।