খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় স্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্রচার করা সিরাজউদ্দৌলা দুলাল (৭৫) নামের এক প্রবীণ ব্যক্তির মরদেহ দাফনে বাধা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মরদেহের মাথায় গভীর জখম ও কাফনের কাপড়ে রক্তের দাগ দেখতে পেয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র সন্দেহ তৈরি হয়। স্বজনরা এটিকে স্ট্রোকজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে দাবি করলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় স্থানীয়রা দাফনকার্য স্থগিত রেখে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশে খবর দেন। আজ রবিবার (৭ জুন) চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্বগুজরা ইউনিয়নের ননা হাজী তালুকদার বাড়িতে জানাজার প্রস্তুতিকালে এই ঘটনা ঘটে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত সিরাজউদ্দৌলা দুলাল ওই এলাকার মৃত আব্দুস সাত্তারের ছেলে। গ্রামের বাড়ি রাউজানে হলেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীর মোহাম্মদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন একটি বাসায় পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিলেন। প্রবাস জীবন শেষ করে গত ১০ থেকে ১২ বছর আগে তিনি স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। ব্যক্তিগত জীবনে সিরাজউদ্দৌলা দুলাল দুটি বিবাহ করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) হওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর প্রথম সংসারে দুই মেয়ে সন্তান রয়েছে, যাদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে সিরাজউদ্দৌলা দুলালের কোনো প্রকার পারিবারিক যোগাযোগ ছিল না। অন্যদিকে, তাঁর দ্বিতীয় সংসারে স্ত্রী এবং তিন সন্তান রয়েছে।
নিহতের দ্বিতীয় পরিবারের স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজ রবিবার সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর মোহাম্মদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন নিজ বাসায় সিরাজউদ্দৌলা দুলালের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে দুপুর ২টার দিকে দাফনকাজের উদ্দেশ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্স যোগে তাঁর মরদেহ পৈত্রিক ভিটা রাউজান উপজেলার পূর্বগুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ননা হাজী তালুকদার বাড়িতে আনা হয়। তবে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি গ্রামে পৌঁছানোর পর লাশের সঙ্গে আসা স্বজনরা প্রথমে মরদেহ গাড়ি থেকে নামাতে অনীহা ও আপত্তি প্রকাশ করেন। স্বজনদের এমন রহস্যজনক আচরণে স্থানীয়দের মনে প্রথম সন্দেহের উদ্রেক হয়।
পরবর্তীতে মরদেহ গাড়ি থেকে নামিয়ে ঘরের ভেতরে নেওয়ার পর উপস্থিত প্রতিবেশীরা নিহতের শেষ চেহারা দেখতে যান। সে সময় তারা সিরাজউদ্দৌলা দুলালের মাথায় ধারাল অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন এবং কাফনের কাপড়ে তাজা রক্তের দাগ দেখতে পান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপস্থিত এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী আসরের নামাজের পর মরদেহের জানাজার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও জখমের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় স্থানীয়রা জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। স্বজনদের পক্ষ থেকে বারংবার এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্রচার করা হলেও গ্রামবাসীরা তা প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি স্থানীয় রাউজান থানা পুলিশকে অবহিত করেন।
এই বিষয়ে নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা বেগম (৬৫) সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, “আমার স্বামীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি মূলত ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।” তবে মাথায় জখম এবং রক্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি পরবর্তীতে আরও জানান যে, মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিহতের শরীরের একাধিক স্থানেও আঘাতের সুনির্দিষ্ট চিহ্ন রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। অন্যদিকে, নিহতের মেয়ে জেনি আকতার এই বিষয়ে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাবা ঠিক কিভাবে মারা গেছেন, সে বিষয়ে আমি কিচ্ছু জানি না। আমি বাবার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর কেবল বাসায় এসেছি।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাউজান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাদ্দাম হোসেন গণমাধ্যমকে পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল করার সময় নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের দাগ পাওয়া গেছে এবং প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে তাঁর মাথায় ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, রাউজান থানা পুলিশ লাশের আনুষ্ঠানিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি সম্পন্ন করেছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট হাতে পেলেই কেবল মৃত্যুর আসল কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।