খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁদের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাঁদের অন্যতম ভাষাসৈনিক গাজীউল হক। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গীতিকার, আইনজীবী এবং ভাষা আন্দোলনের সাহসী সংগঠক। তাঁর পুরো নাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি শুধু একজন কর্মীই ছিলেন না, বরং ছিলেন সংগ্রামের অগ্রসৈনিক, যাঁর কণ্ঠে ও কলমে উচ্চারিত হয়েছিল মাতৃভাষার অধিকারের অমোঘ প্রত্যয়।
১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী এবং মাতা নূরজাহান বেগম ছিলেন একজন স্নেহময়ী ও আদর্শবান নারী। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি দেশপ্রেম, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করেন।
শৈশবে মক্তবে শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও পরবর্তীকালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী আযিযুল হক কলেজে অধ্যয়নকালে ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সান্নিধ্যে এসে তিনি রাজনীতি ও সমাজচিন্তায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ছিলেন তিনি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন ঘোষণা করল— “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”, তখন প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পূর্ব বাংলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভা, ধর্মঘট ও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে গাজীউল হকের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, যখন তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল, তখন সেই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারী সাহসী ছাত্রনেতাদের অন্যতম ছিলেন গাজীউল হক। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর এই ভূমিকা এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
ভাষা আন্দোলনের আবেগ ও চেতনাকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর গানে। তাঁর রচিত বিখ্যাত গান—
“ভুলব না, ভুলব না, ভুলব না
এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না”—
১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরির প্রধান সংগীত হিসেবে গাওয়া হতো। এই গান ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে ধারণ করে আন্দোলনের চেতনাকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিল।
পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন সফল আইনজীবী। ১৯৫৭ সালে আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায়ের সনদ লাভ করেন এবং ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে যোগদান করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন দক্ষ ও সম্মানিত আইনজীবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।আইন ও রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— জেলের কবিতা, এখানে ও সেখানে একটি কাহিনী, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এগিয়ে চলো, মোহাম্মদ সুলতান এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন প্রভৃতি। এসব রচনায় দেশপ্রেম, সংগ্রাম, ইতিহাসচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছে।
জাতির জন্য তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রভাষা পদক, সম্মাননা স্মারক এবং শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।
২০১৯ সালের ১৭ জুন এই মহান ভাষাসৈনিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনসংগ্রাম, তাঁর গান, তাঁর আদর্শ এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা আজও আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন ও যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, গাজীউল হক তাঁদেরই একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ভাষার জন্য তাঁর অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, ভাষাসৈনিক গাজীউল হক।
“যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে তাঁর নাম ও তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস।”