খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সরোদ বাদক, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ্বদূত এবং সুরসাধনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা, সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ছিলেন মাইহার রাজ্যের সভাসঙ্গীতজ্ঞ। পিতার সান্নিধ্যেই মাইহারে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। মাত্র তিন বছর বয়সে কণ্ঠসঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা হয়। পিতা ছিলেন অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী; ফলে ছোটবেলা থেকেই আলী আকবর খাঁ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তালিম গ্রহণের সুযোগ পান।
নয় বছর বয়সে পিতা তাঁর হাতে তুলে দেন সরোদ। এরপর ১৯৩৩ সালে চাচা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ নিজ হাতে নির্মিত একটি সরোদ তাঁকে উপহার দেন। সেই সরোদকে সঙ্গী করেই তিনি আজীবন সুরসাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, তিনি প্রতিদিন প্রায় আঠারো ঘণ্টা রেওয়াজ করতেন—যা তাঁর অসামান্য নিষ্ঠা ও সাধনার পরিচায়ক।
মাত্র তেরো বছর বয়সে এলাহাবাদে প্রথমবারের মতো মঞ্চে সরোদ পরিবেশন করে তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। চল্লিশের দশক থেকে বিভিন্ন সঙ্গীত সম্মেলনে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে দ্রুত খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়।
১৯৩৮ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও-এর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৪৩ সালে যোধপুর রাজ্যের সভাসঙ্গীতজ্ঞ নিযুক্ত হন এবং সেখানে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৪৮ সালে মুম্বাইয়ে এসে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনায় যুক্ত হন। তাঁর সুরারোপে সমৃদ্ধ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধিত পাষাণ এবং ঝিন্দের বন্দী।
১৯৫৫ সালে তিনি প্রথম ইংল্যান্ড এবং পরে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। পাশ্চাত্যের টেলিভিশন পর্দায় প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে প্রথম যাঁরা পৌঁছে দেন, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। একই বছরে নিউইয়র্ক থেকে তাঁর লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা আমেরিকায় প্রকাশিত প্রাচ্য সঙ্গীতের অন্যতম প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে জর্জ হ্যারিসন-এর উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ তিনি অংশগ্রহণ করেন। সেখানে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আল্লা রাখা-এর সঙ্গে পরিবেশিত ‘বাংলাদেশ ধুন’ আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এক অনবদ্য সৃষ্টি।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণ-এ ভূষিত করে। তিনি দুইবার ‘প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন এবং জন এফ. কেনেডি-এর অভিষেক অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণের বিরল সম্মান অর্জন করেন।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। একইভাবে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জিনিয়াস ফেলোশিপ’ প্রদান করে। ১৯৭০ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে তিনি পাঁচবার গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সঙ্গীতসাধনার বিশ্বজনীন স্বীকৃতির উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
সুরের এই মহাসাধক ২০০৯ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—প্রতিভা জন্মগত হতে পারে, কিন্তু মহত্ত্ব অর্জিত হয় নিরলস সাধনা, অধ্যবসায় এবং শিল্পের প্রতি আজীবন নিবেদনের মাধ্যমে। উপমহাদেশের সঙ্গীতভুবনে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ আজও এক কিংবদন্তি, যাঁর সুরধারা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, সুরসাধক ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ।