যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা: নেত্রকোনায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

নেত্রকোনায় যৌতুকের দাবিতে পারভীন আক্তার নামে এক গৃহবধূকে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে স্বামী শফিকুল ইসলামকে (৪২) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানা অনাদায়ে আসামিকে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক একেএম এমদাদুল হক জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় এই মামলার অন্য দুই আসামি শফিকুলের বাবা তোরাব আলী ও মা সখিনা খাতুনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত আসামি শফিকুল ইসলাম কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে কঠোর নিরাপত্তা প্রহরায় তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আদালত ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার রত্নপুর গ্রামের সোনা মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তারের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল কলমাকান্দা উপজেলার ক্ষুদ্র সিধলী গ্রামের তোরাব আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামের। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুটি পুত্রসন্তান রয়েছে। তবে সুখের এই সংসারে অল্প দিনেই যৌতুকের কালো ছায়া নেমে আসে। বিয়ের পর থেকেই শফিকুল এবং তার বাবা-মা নানা সময়ে পারভীনের পরিবারের কাছে টাকা ও মূল্যবান আসবাবপত্রের জন্য চাপ দিতে থাকেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ শফিকুল ইসলাম তার স্ত্রীর কাছে নতুন করে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। পারভীন আক্তার বাবার গরিব পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে এই টাকা এনে দিতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শফিকুল ও তার পরিবারের সদস্যরা পারভীনকে নির্মমভাবে মারধর করেন। স্বামীর এই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সন্তানদের নিয়ে পারভীন বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন।

এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সালিশি বৈঠক বা আপস মীমাংসা করা হয়। সেখানে আর নির্যাতন করা হবে না—এমন শর্তে পারভীনকে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আশ্বাস ছিল স্রেফ একটি ফাঁদ।

আপসের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল গভীর রাতে পারভীনের বাবার বাড়িতে তার আকস্মিক মৃত্যুর খবর পাঠানো হয়। খবর পেয়ে রাতেই পারভীনের স্বজনরা দ্রুত শ্বশুরবাড়িতে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা ঘরের বারান্দায় পারভীনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, পারভীনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে গলায় ও পিঠে গুরুতর আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। পারভীনের পরিবারের পক্ষ থেকে খবর দেওয়া হলে কলমাকান্দা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও পারভীনকে শ্বাসরোধ ও আঘাতের কারণে হত্যার প্রমাণ মেলে।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর পারভীনের ভাই মো. আবু ইউসুফ বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শফিকুল ইসলাম, তার বাবা তোরাব আলী, মা সখিনা খাতুনসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিশেষ কৌঁসুলি (পিপি) মো. নুরুল কবির রুবেল এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা পর্যালোচনা করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত শফিকুলকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।