পাবনার ভাঙ্গুড়ায় এক সাবেক যুবলীগ নেতাকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নাশকতার সন্দেহে পুলিশ তাকে আটক করলে প্রায় তিন শতাধিক বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে অবস্থান নেন। তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে অবশেষে আটককৃত ওই নেতাকে স্থানীয় প্রতিনিধিদের জিম্মায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় থানা পুলিশ।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাবনার ভাঙ্গুড়া থানায় এই নাটকীয় ও উত্তেজনাকর ঘটনাটি ঘটে। আটককৃত যুবলীগ নেতার নাম রিপন সরকার (৪০)। তিনি উপজেলার পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের পাটুলিপাড়া গ্রামের হাবিবুর সরকারের ছেলে এবং পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ও আটক
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ভাঙ্গুড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পাটুলিপাড়া গ্রামে অভিযান চালায়। সাম্প্রতিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ সেখান থেকে রিপন সরকারকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। যুবলীগ নেতাকে আটকের খবরটি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
নেপথ্যে জমির বিরোধ ও গ্রামবাসীর দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই আটকের পেছনে রাজনৈতিক বা নাশকতামূলক কোনো কারণ নেই, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্থানীয় জমির বিরোধ। টেবুনিয়া-বাঘাবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন পাটুলিপাড়া গ্রামের একটি মূল্যবান খাসজমি ও স্থানীয় ছোট বাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ গ্রামবাসীদের সঙ্গে ইউনুস সরকার নামের এক ব্যক্তির বিরোধ চলে আসছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাসজমি বেআইনিভাবে দখল করে ইউনুস সরকার সেখানে একটি ঘর নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই অবৈধ ঘরটি ভেঙে ফেলেন এবং সেখানে পুনরায় মাছের বাজার স্থাপন করেন। একই সাথে স্থানটিকে ‘ছোট বাজার ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড’ হিসেবে ঘোষণা করে ব্যানার টাঙিয়ে দেন।
অন্যদিকে, ইউনুস সরকার ওই জায়গাটি নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি দাবি করে রিপন সরকারসহ গ্রামের বেশ কয়েকজন বাসিন্দাকে অভিযুক্ত করে ভাঙ্গুড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। গ্রামবাসীর দাবি, এই ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে রিপন সরকার সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন। মূলত গ্রামবাসীদের আন্দোলনকে স্তিমিত করতে এবং রিপন সরকারকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই ইউনুস সরকারের সাজানো অভিযোগে পুলিশ এই আটকের নাটক সাজিয়েছে।
থানা ঘেরাও ও ওসির বক্তব্য
রিপন সরকারকে থানায় নিয়ে আসার পরপরই পাটুলিপাড়া গ্রামের প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ একজোট হয়ে ভাঙ্গুড়া থানা চত্বরে এসে হাজির হন। তারা রিপন সরকারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে থানার সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে থানা চত্বরের বাইরে প্রধান ফটকের সামনে সরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উত্তেজনা চলাকালীন ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজম উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমি যুবলীগের সভাপতিকে নিয়ে এসেছি। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা কি মব (Mob) করতে চান? এই মুহূর্তে থানা এলাকা ছেড়ে চলে যান।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় দায়িত্বশীল নেতাদের সাথে কথা বলেছেন এবং জানতে পেরেছেন যে রিপন চলমান কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ওসির এমন বক্তব্যে উপস্থিত গ্রামবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।
সমঝোতা ও জিম্মায় মুক্তি
থানার বাইরে গ্রামবাসীদের ক্রমাগত স্লোগান এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে একপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন নমনীয় হতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারীদের মধ্য থেকে শীর্ষ ৫ জন প্রতিনিধিকে ওসির কক্ষে আলোচনার জন্য ডাকা হয়। ওসির কক্ষে দীর্ঘ আলোচনার পর, গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধিদের লিখিত জিম্মায় রিপন সরকারকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিনিধিদল রিপন সরকারকে সাথে নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এ বিষয়ে পরবর্তীতে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিপন সরকারকে থানায় আনা হয়েছিল। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে নাশকতার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। একই সাথে স্থানীয় গ্রামবাসীদের দাবি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তাকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।



