খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১০:৭ এএম
বয়স চল্লিশের কোটা পেরিয়েছে আগেই। সমসাময়িক ফুটবলারদের অনেকেই বুটজোড়া তুলে রেখে এখন কোট-টাই পরে টিভি পর্দায় ম্যাচ বিশ্লেষকের ভূমিকায়। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যেন অন্য ধাতুতে গড়া। বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যা বানিয়ে এই বয়সেও তিনি খেলে যাচ্ছেন দাপটের সঙ্গে। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসেও ক্লান্তিহীনভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন পর্তুগাল দলকে। তবে এবার সম্ভবত মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় চলে এসেছে। শেষ ষোলোর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার।
মাঠে নামার আগের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবেই পর্তুগিজ অধিনায়কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই বিশ্বকাপ শেষেই তিনি খেলা চালিয়ে যাবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রোনালদো তাঁর স্বভাবসুলভ দৃঢ়তায় বলেন, “আমি যখন ইচ্ছা করব, তখনই অবসর নেব। আপনাদের ইচ্ছা বা কথায় আমি সিদ্ধান্ত নেব না। এই মুহূর্তে দলের জয়ই আমার একমাত্র চিন্তা ও লক্ষ্য।”
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা রাখলেও বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ইতি টানার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন সিআরসেভেন। তিনি বলেন, “যতটা পারছি এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করার চেষ্টা করছি। কারণ, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ। আশা করি, স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটাই বিশ্বমঞ্চে আমার শেষ ম্যাচ হবে না।”
দিনকয়েক আগে রোনালদোর বোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই বিশ্বকাপ শেষেই পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা যাবে না সিআরসেভেনকে। কিন্তু রোনালদো সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, আবেগের বশে বা কারও কথায় তিনি হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির মতো রোনালদোর সামনেও ছিল ২০৩০ বিশ্বকাপের এক দারুণ সুযোগ। কারণ, সেই আসরটি যৌথভাবে আয়োজন করবে পর্তুগাল, স্পেন ও মরক্কো। নিজ দেশে বিশ্বকাপের শতকপূর্তির এই বিশেষ আসরে খেলার রোমাঞ্চ যে কাউকে ছুঁয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তত দিনে রোনালদোর বয়স দাঁড়াবে ৪৫ বছর। সেই বয়সে মাঠে নামলে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বিশ্বকাপার হিসেবে রেকর্ড গড়তেন। তবে রোনালদো বাস্তববাদী, শরীর ও সময়ের ডাক শুনতে পাচ্ছেন তিনি।
বিদায়ের সুর কণ্ঠে তুলে এই ফুটবল কিংবদন্তি বলেন, “একদিন না একদিন তো বুটজোড়া তুলে রাখতেই হবে। সত্যি বলতে, আগামীকালের ম্যাচে যা–ই ঘটুক না কেন, আমি মাঠ ছাড়ব নিজের হাজার ভাগ উজাড় করে দিয়ে। ফুটবলকে আমি আমার জীবনের সবটুকু দিয়েছি, আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই। আমি ফুটবল খেলি কারণ এই খেলাটাকে আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসি। ভালোবাসা না থাকলে এই বয়সে এসেও এমন সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া সম্ভব হতো না। এই বিশ্বকাপেও তো ৪ ম্যাচে ৩ গোল করলাম। খুব একটা খারাপ করছি না, তাই না?”
চলতি বিশ্বকাপে রোনালদোর পারফরম্যান্স আসলেই দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য এক কীর্তি গড়েন তিনি। এ ছাড়া নকআউট পর্বে গোল করতে না পারার যে দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ছিল, সেটিও এবার ঘুচিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দৃষ্টিনন্দন এক গোল করে।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ পরাশক্তি স্পেন। স্প্যানিশদের বিপক্ষে রোনালদোর অতীত রেকর্ড বেশ সমৃদ্ধ, যা পর্তুগাল শিবিরকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের রক্ষণভাগ চূর্ণবিচূর্ণ করে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। এমনকি ২০২৫ সালের নেশনস কাপের ফাইনালেও স্পেনের জাল কাঁপিয়েছিলেন এই মহাতারকা। ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এসে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে আরও একবার নিজেকে উঁচিয়ে ধরতে মুখিয়ে আছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ এই গোলদাতা। বিদায়ের আগে ফুটবল বিশ্বকে আরও একটি জাদুকরী রাত উপহার দিতে পারেন কি না রোনালদো, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
মন্তব্য