সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের সরদারপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় শোকের পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠেছে।
এর আগে রাত ১১টার দিকে কপোতাক্ষ নদ পেরিয়ে ট্রলারে করে মরিয়মের মরদেহ গাবুরায় নেওয়া হয়। মরদেহ আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে নদীর তীরে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে। স্বজনদের সঙ্গে ছিলেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ, মা, দাদি, নানি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়।
পরে গাবুরা পশ্চিমপাড়ার সরদার বাড়ি জামে মসজিদের পাশে মরিয়মের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনিরুদ্ধ রায় ও বদিউজ্জামান, গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য গোলাম মোস্তফাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে মরিয়মকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মরিয়মের অকালমৃত্যুর খবর তাঁদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। আমিনুর রহমান বলেন, অল্প বয়সে একজন তরুণীর এমন মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না; ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সঠিক তদন্ত প্রয়োজন। হালিমা খাতুন জানান, মরিয়ম ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বড় হয়েছেন এবং গ্রামে তাঁর যাতায়াত ছিল সীমিত। তাই এভাবে তাঁর মরদেহ গ্রামে ফিরবে—এটি কেউ ভাবেননি।
মরিয়মের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত চলমান থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নও রয়েছে। আলতাফ হোসেন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, পরিবারের সদস্যরা যাতে ন্যায়বিচার পান, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা। ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফাও মরিয়মের অকালমৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তাঁর জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
মঙ্গলবার সকাল থেকে মরিয়মের বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের আনাগোনা ছিল। বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ সেখানে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। তবে মরিয়মের বাবা-মা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয় পারুল বেগম জানান, মেয়ের মৃত্যুতে তাঁরা এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে এ মুহূর্তে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।
মরিয়মের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে একটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। গত রোববার ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার আদালতে তাঁদের হাজির করে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। শুনানি শেষে আদালত গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মামলার অপর আসামি ওবায়দুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাঁকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং মামলায় আনা অভিযোগের সত্যতা—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা হবে এবং দায় প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


