খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ৪:৫ পিএম
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় পারিবারিক বিরোধ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০ মাস বয়সী শিশুসন্তানকে বিষ খাইয়ে নিজে বিষপান করেছেন এক গৃহবধূ। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই নারীর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার শিশুসন্তানটি রাজধানীর একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের ব্রাহ্মন্দী মধ্যপাড়া গ্রামে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মন্দী মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গফুরের দুই ছেলে বাদল মিয়া ও আব্দুস সাত্তারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছিল। এই নিয়ে প্রায়ই দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটত।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, গত রোববার (৫ জুলাই) দুই ভাইয়ের মধ্যে আবারও পারিবারিক বিরোধ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বড় ভাই বাদল মিয়া ছোট ভাই আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী আরিফা বেগমকে (২৭) কাঠের টুকরো দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। কাকতালীয়ভাবে, ওই দিনই আব্দুস সাত্তারের সৌদি আরব যাওয়ার পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট ছিল। পারিবারিক অশান্তির মধ্যেই জীবিকার তাগিদে তিনি দুপুরের দিকে বিমানে চড়ে বসেন। স্বামী বিদেশে রওনা দেওয়ার পর বিকেলে একা পেয়ে বাদল মিয়া আবারও আরিফাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও চরম অপমান করেন বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন।
স্বজনরা জানান, স্বামীর অনুপস্থিতিতে এই উপর্যুপরি নির্যাতন ও লোকলজ্জার অপমান সহ্য করতে না পেরে আরিফা বেগম চরম মানসিক হতাশায় ভুগতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে তিনি প্রথমে তাঁর ২০ মাস বয়সী একমাত্র ছেলে রিয়াদুলকে বিষ খাইয়ে দেন এবং পরে নিজেও সেই বিষ পান করেন। প্রতিবেশীরা টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মা ও ছেলেকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যান।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার বিকেলে আরিফা বেগম মারা যান। তবে সৌভাগ্যবশত শিশু রিয়াদুল এখনো বেঁচে আছে এবং ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। এদিকে বিমানে থাকা অবস্থায় এবং সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর স্ত্রীর বিষপান ও মৃত্যুর খবর পান প্রবাসী আব্দুস সাত্তার। এমন শোকার্ত সংবাদ পেয়ে তিনি আর প্রবাসে থাকতে পারেননি। পরদিনই অর্থাৎ মঙ্গলবার রাতে তিনি জরুরি ভিত্তিতে দেশি ফ্লাইটে করে নরসিংদীতে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।
প্রবাসী আব্দুস সাত্তার ও আরিফা দম্পতির ঘরে তিন সন্তান রয়েছে। তাদের বড় দুই মেয়ে তৈয়বা (১০) ও হাফসা (৮) মায়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে অসহায় স্বামী আব্দুস সাত্তার বাদী হয়ে শিবপুর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহত গৃহবধূ আরিফার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতের স্বামী আপাতত একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন। তবে পারিবারিক এই কলহ ও আত্মহত্যার পেছনে মূল কারণ কী এবং মারধরের ঘটনা কতখানি দায়ী ছিল, তা উদঘাটনে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর এবং তদন্ত শেষে এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য