খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ১২:২১ পিএম
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র, গ্লাইড বোমা ও ড্রোন দিয়ে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। শনিবারের এই ভয়াবহ হামলায় অন্তত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে লক্ষ্য করে এই বিমান হামলা চালানো হয়। হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আরও দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন এবং এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
বর্তমানে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত গোলাবারুদের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিয়েভ এখন পশ্চিমা দেশগুলোর নতুন সরবরাহের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
শনিবার ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী সুমি শহরের একটি ব্যস্ত এলাকায় দুটি শক্তিশালী গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করে রুশ বাহিনী। এতে পাঁচজন নিহত হন এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বোমা সরাসরি একটি বাসস্টপে আঘাত হানে। হামলার পর প্রকাশিত ছবিতে একটি যাত্রীবাহী হলুদ বাসের এক পাশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে দেখা গেছে। অন্য একটি ছবিতে কাছের আবাসিক ভবনের সামনের অংশ লণ্ডভণ্ড অবস্থায় দেখা যায়। এছাড়া সুমি অঞ্চলের একটি সীমান্তবর্তী জেলায় বিস্ফোরক যন্ত্রে পা পড়ে আরও একজন পুরুষ নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
অন্য দিকে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জাপোরিঝঝিয়া শহরে রুশ গ্লাইড বোমা হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর। দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ওডেসায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন নিহত এবং একজন আহত হন। পূর্বাঞ্চলের খারকিভ শহরের একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে ড্রোন হামলায় আরও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাতের নিয়মিত ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে, যাতে অস্ত্র সরবরাহের চুক্তিগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। তিনি জানান, ইউক্রেনের কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করতে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে নতুন মাত্রার সমন্বয় গড়ে তোলা হবে। জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেন, বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে যেসব প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া একটি সমঝোতার আওতায় ইউক্রেনকে নিজস্ব প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার কথা রয়েছে, সেই চুক্তিও দ্রুত কার্যকর হওয়া দরকার। ইউক্রেন জানিয়েছে, তাদের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদ এখন খুবই সীমিত। গত এক মাসে রাশিয়ার ছোড়া উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বেশির ভাগই প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে কিয়েভ মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদ চেয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
শনিবার রাতেও রাজধানী কিয়েভে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে হামলা চালায় রাশিয়া। এতে অন্তত ১২ জন আহত হন। হামলার পর জেলেনস্কি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারির আগেই বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত করা হয়েছে। তিনি জানান, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাবাহিনী বেশির ভাগ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারেনি। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, ওডেসা, খারকিভ ও সুমিতে দিনের হামলার আগে রাতেই রাশিয়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ছয়টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২১টি ড্রোন নিক্ষেপ করে। বিমানবাহিনীর দাবি, তারা অন্তত দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১১১টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে কিয়েভে হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মাসেই রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রুশ হামলায় ৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউক্রেনও রাশিয়ার দখল করা দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর প্রধান রবার্ট ব্রোভদি জানান, তার ইউনিট এক রাতেই আজভ সাগরে ২১টি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া আরও সাতটি পণ্যবাহী ও সহায়ক জাহাজেও হামলা হয়েছে। তার দাবি, চলতি সপ্তাহে মোট ৭৬টি জাহাজ ইউক্রেনের ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জেলেনস্কি বলেছেন, এসব ড্রোন অভিযানের উদ্দেশ্য রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেননি। এদিকে রাশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজভ সাগরের তাগানরগ উপসাগরে মিথানল বহনকারী একটি ট্যাংকারসহ চারটি জাহাজে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
মন্তব্য