দি গার্ডিয়ান
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ৭:৬ এএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তাঁর অভিযোগ, এই বিশ্ব আদালত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছে, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি। সোমবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নতুন প্রচারণার বিষয়টি উঠে আসে।
এদিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে রুবিওর একটি দীর্ঘ মতামত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচিত নেতাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রুবিও সতর্ক করে বলেন, মার্কিন প্রশাসন যদি এখন নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে তাদের দেশের কর্মকর্তা ও সেনাদের হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশি বিচারকদের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে। নিজেদের দেশ রক্ষার তথাকথিত অপরাধে তাঁদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় মামলা হতে পারে, এমনকি কারাদণ্ডেরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিসিকে নিষ্ক্রিয় বা ভেঙে দিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইসিসির সদস্য দেশগুলোকে এই আদালত ত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তারা যদি আইসিসির কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান না করে, তবে তাদের কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে হবে। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপও থাকতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা রুবিওর এই বক্তব্যকে আইসিসির ক্ষমতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন বলে মন্তব্য করেছেন। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কেবল সেসব দেশে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে পারে, যারা রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ২০০২ সালে রোম চুক্তির মাধ্যমে আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই চুক্তি অনুমোদন করেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত কোনো অপরাধ নিয়ে আইসিসি কখনো কোনো তদন্তও শুরু করেনি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডে কোনো বিচারিক এখতিয়ার দাবি করছে না। রুবিও মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধে দায়মুক্তির প্রচেষ্টাকেই আড়াল করতে চাইছেন। অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে আইসিসির শরণাপন্ন হওয়ার যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম অধিকার রয়েছে, মার্কিন প্রশাসন তা পুরোপুরি উপেক্ষা করছে। কেনেথ রথ আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে যে দেশগুলো আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মেনে নিয়েছে, সেসব দেশের ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ করার মার্কিন সুযোগটি ধরে রাখতে চায়।
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারকে স্বাগতও জানিয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে, রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশ ইউক্রেনে রাশিয়ার কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করায় আইসিসির পদক্ষেপকে তারা জোরালো সমর্থন দিয়েছিল।
তবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের নেতৃত্বাধীন দপ্তরের তদন্ত শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে যায়। ফিলিস্তিন আইসিসির সদস্য হওয়ায় আদালত এই তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
এই ঘটনার পর দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, তাঁর দুই উপপ্রধান এবং ছয়জন বিচারক এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েন। মূলত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাসদস্যদের কার্যকলাপ নিয়ে তদন্তের কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে এই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়িয়ে দেয়। সে সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানিজ এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে যুক্ত তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধেও মার্কিন প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে রুবিওর আইসিসিকে ‘ভেঙে দেওয়ার’ এই নতুন অঙ্গীকার বাস্তবে বিশ্ব আদালতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে।
মন্তব্য