খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ৬:৪৭ এএম
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যচর্চার ইতিহাসে যে কজন মানুষের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের অগ্রভাগে রয়েছেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। তিনি শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতিই নন, বরং বাংলাদেশের স্থাপত্য-ভাবনা, নগর পরিকল্পনা ও নান্দনিক নির্মাণশৈলীর অন্যতম প্রধান রূপকার। তাঁর হাত ধরেই এদেশে আধুনিক স্থাপত্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি হিসেবে তিনি স্থাপত্য পেশাকে সুসংগঠিত করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল চিন্তক, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
জন্ম ২৫ জুলাই ১৯২৩ সালে, অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে। তাঁর পিতা ওমদাতুল ইসলাম ছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজের গণিতের শিক্ষক।
শৈশবের পড়াশোনা শুরু হয় কৃষ্ণনগর কলেজ স্কুলে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়নের পর পিতার বদলির কারণে তিনি রাজশাহীতে চলে আসেন। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে একই কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান আইআইইএসটি, শিবপুর) প্রকৌশলবিদ্যায় অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৪৬ সালে সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব বাংলার সরকারি নির্মাণ বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু প্রকৌশলেই নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থাপত্যকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।
১৯৫০ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে মাত্র ছয় মাসের নিরলস পরিশ্রমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) এবং বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ভবনের নকশা প্রণয়ন করেন। জলবায়ু, আলো-বাতাস, প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যের যে অনন্য সমন্বয় তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা আজও স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুকরণীয় উদাহরণ।
১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডনের প্রখ্যাত এএ স্কুল অব আর্কিটেকচার-এ ট্রপিক্যাল আর্কিটেকচার বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বখ্যাত স্থপতি পল রুডলফ-এর অধীনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
১৯৬১ সালের শেষ দিকে দেশে ফিরে তিনি পুনরায় সরকারি দায়িত্বে যোগ দিলেও স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিপন্থী পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তাই ১৯৬৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে ‘বাস্তুকলাবিদ’ নামে একটি স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যচর্চায় নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্থাপত্য অনুষদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য। তিনি সেখানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেন এবং নতুন প্রজন্মের স্থপতিদের মধ্যে সৃজনশীল ও মানবিক স্থাপত্যচিন্তার বীজ বপন করেন।
মাজহারুল ইসলামের নকশায় নির্মিত বহু স্থাপনা আজও বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন। তাঁর সৃষ্টিকর্মে স্থানীয় আবহাওয়া, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যের এক অসাধারণ সংলাপ গড়ে উঠেছে। তাঁর দর্শন ছিল—স্থাপত্য কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ইতিহাস, জীবনবোধ ও স্বপ্নের শিল্পিত প্রকাশ।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা প্রণয়নের জন্য বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই. কান-কে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর পেছনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্থাপত্যকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতা, দর্শন এবং নির্মাণকর্ম আজও বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চার প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
প্রয়াণদিবসে এই মহান স্থপতির স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর কর্ম, দর্শন ও সৃজনশীলতা আগামী প্রজন্মকে দীর্ঘকাল পথ দেখাবে।
মন্তব্য