এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব বেড়ে ২ কোটি ৭২ লাখ

দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খোলা ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাব দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টি। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় তিন মাসে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, এপ্রিল-জুন ২০২৬’ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর মানুষের নির্ভরতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

জুন শেষে দেশের ৩০টি ব্যাংক ১৫ হাজার ৪২৪ জন এজেন্টের মাধ্যমে মোট ২০ হাজার ৫৯৭টি আউটলেট পরিচালনা করছিল। তিন মাসের ব্যবধানে এজেন্টের সংখ্যা বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে আউটলেটের সংখ্যা বেড়েছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের হিসাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নারী ও গ্রামীণ গ্রাহকদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোট ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টি হিসাবের মধ্যে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৮টি নারীদের নামে। অর্থাৎ মোট হিসাবের প্রায় অর্ধেকই নারী গ্রাহকদের। অন্যদিকে ২ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৫টি হিসাব বা প্রায় ৮৫ শতাংশ হিসাব গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি হিসাবের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশেষ করে চলতি প্রান্তিকে নারী গ্রাহকদের হিসাব ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যা পুরুষ গ্রাহকদের হিসাব বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি।

আমানত ও ঋণে বড় প্রবৃদ্ধি

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। জুন শেষে এই চ্যানেলে সংগৃহীত মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১৯,০৭২.৯২ মিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এ প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।

ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধির হার আরও বেশি। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৮,৭০৩.৯৭ মিলিয়ন টাকা, যা প্রায় ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার সমান। মার্চের তুলনায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

এর ফলে জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঋণ-আমানত অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে। মার্চে এ অনুপাত ছিল ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এজেন্ট আউটলেটগুলো শুধু আমানত সংগ্রহের কেন্দ্র হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৩টি ব্যাংক ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ঋণ বিতরণে গ্রামীণ গ্রাহকদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ, অর্থাৎ ২৬২,২৬৩.৯৯ মিলিয়ন টাকা পেয়েছেন গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকেরা। তবে নারী গ্রাহকদের ঋণপ্রাপ্তির হার তুলনামূলকভাবে কম। নারীরা মোট ৫২,০০২.০৬ মিলিয়ন টাকা ঋণ পেয়েছেন, যা মোট ঋণের ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা ও নারী গ্রাহকদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

রেমিট্যান্স পৌঁছাচ্ছে গ্রামেও

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জুন শেষে এজেন্টদের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,১৪৯.০৪১ মিলিয়ন টাকা। মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

রেমিট্যান্স বিতরণে গ্রামীণ এলাকার মানুষের অংশগ্রহণও অত্যন্ত বেশি। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা মোট রেমিট্যান্সের ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশ পেয়েছেন গ্রামীণ এলাকার সুবিধাভোগীরা। ফলে ব্যাংকের শাখা কম থাকা বা দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের কাছে প্রবাসী আয় পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এজেন্ট ব্যাংকিংকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে প্রচলিত ব্যাংক শাখার আওতার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আমানত, ঋণ, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা ভূমিকা রাখছে।

নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে

শুধু গ্রাহক হিসেবে নয়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উদ্যোক্তা হিসেবেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংক ১ হাজার ৭৭৬ জন নারী উদ্যোক্তার মালিকানাধীন ২ হাজার ১০৬টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা করছিল।

নারী উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন এসব আউটলেট দেশের মোট এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের ১০ দশমিক ২২ শতাংশ। এসব আউটলেটে মোট ২৩ লাখ ৪০ হাজার হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৪০ হাজার হিসাব গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের।

বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা সিএমএসএমই খাত এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ঋণ-আমানত অনুপাত বৃদ্ধির ধারাও এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়নের পরিধি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এক দশকের বেশি সময়ের যাত্রা

বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয় ২০১৩ সালে। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত ব্যাংক শাখার বাইরে থাকা এবং ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া। সময়ের সঙ্গে এ ব্যবস্থা শহরতলি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরেও বিস্তৃত হয়েছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রাহকেরা আমানত রাখা, ঋণ গ্রহণ, রেমিট্যান্স সংগ্রহ, বিভিন্ন বিল পরিশোধ এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নেওয়ার মতো সেবা পাচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপনের তুলনামূলক সীমাবদ্ধতা থাকা এলাকাতেও মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

জুন ২০২৬-এর পরিসংখ্যান বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিং এখন শুধু হিসাব খোলার বিকল্প মাধ্যম নয়; আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, রেমিট্যান্স পৌঁছে দেওয়া এবং নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা বিস্তৃত হচ্ছে। তবে নারী গ্রাহকদের ঋণপ্রাপ্তির অংশ তুলনামূলক কম থাকায় ভবিষ্যতে এই ব্যবধান কমানো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে থাকবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।