বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) নিলাম থেকে বাদ পড়ার পর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফিক্সিং বা দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচনায় আসা নয় ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ আনেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) স্বাধীন দুর্নীতি দমন ইউনিট (আকসু)। তাদের বিরুদ্ধে খেলার ওপরও বর্তমানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
শনিবার মিরপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আকসু প্রধান অ্যালেক্স মার্শাল বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, তদন্তের কারণে ওই ক্রিকেটারদের খেলতে কোনো বাধা নেই। এর আগেই তারা খেলার অনুমতিও পেয়েছেন।
বিপিএলের দ্বাদশ আসরের আগে চূড়ান্ত নিলাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন দুর্বার রাজশাহীর এনামুল হক, শফিউল ইসলাম, সানজামুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান। একইভাবে ঢাকা ক্যাপিটালসের মোসাদ্দেক হোসেন ও আলাউদ্দিন বাবু এবং সিলেট স্ট্রাইকার্সের আরিফুল হক ও নিহাদুজ্জামানের নামও নিলামের চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়নি।
নয়জনের নাম ঘিরে প্রশ্ন তৈরি হয় গত বিপিএল শুরুর আগেই। পরে জানা যায়, প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার একটি তথ্য-অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাদেরসহ কয়েকজন দেশি-বিদেশি ক্রিকেটারকে নিয়ে নেতিবাচক তথ্য উঠে এসেছিল। তবে ওই প্রতিবেদন নিজেই কোনো ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী বিধি লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সমতুল্য ছিল না।
আকসুর তদন্তের ফল কী হতে পারে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যালেক্স মার্শাল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ তদন্তাধীন ব্যক্তির ন্যায্য শুনানির অধিকার এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মার্শাল বলেন, তদন্ত শেষ হলে মূলত তিন ধরনের ফল হতে পারে। শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হতে পারে। প্রমাণ অভিযোগ আনার মতো যথেষ্ট না হলে বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে। আর কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, নিলাম থেকে বাদ পড়া মানেই ওই ক্রিকেটাররা দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেই। একই সঙ্গে তদন্তে তাদের নাম উঠে আসায় বিষয়টি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমনটিও বলা যাচ্ছে না। আকসুর অনুসন্ধান কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, সম্প্রতি বিসিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুর্নীতিবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তারা হলেন বিসিবির সাবেক পরিচালক মুহাম্মদ মোখলেসুর রহমান, সাবেক নিরাপত্তা সমন্বয় কর্মকর্তা (এসএলও) জাকির হোসেন এবং বগুড়া জেলার সাবেক কাউন্সিলর ও বিসিবির অডিট কমিটির সাবেক সদস্যসচিব রাকিবুল ইসলাম সানি। তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।
তবে নয় ক্রিকেটারের বিষয়ে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। অ্যালেক্স মার্শালও তাদের তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
আকসু প্রধান আরও জানান, আলোচিত নয়জনের বাইরেও কয়েকজন দেশি ও বিদেশি ক্রিকেটারের নাম তদন্তে এসেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
আকসুর আইনি পরামর্শক মাহিন এম রহমান জানিয়েছেন, ৯০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনটি সরাসরি অ্যান্টি-করাপশন কোড ভঙ্গের তদন্ত ছিল না। ফলে প্রতিবেদনে কারও বিষয়ে নেতিবাচক তথ্য থাকার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়।
ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষ করে ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ের মতো অভিযোগ একজন ক্রিকেটারের পেশাগত ভবিষ্যৎ ও সুনামের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত না করার নীতিই অনুসরণ করছে আকসু।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নয় ক্রিকেটারের অবস্থান তাই এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে—তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত নন, আবার তদন্তের পরিধি থেকেও পুরোপুরি মুক্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিতভাবে বলা হয়নি। তদন্তে প্রমাণের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।


