খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে ওয়াশিংটন আবারও তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। গত শুক্রবার (১০ জুলাই) কংগ্রেসে পাঠানো মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি চিঠি সংবাদমাধ্যমের হাতে আসার পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ দীর্ঘদিন ধরেই প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর লাগাম টানার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঘটনায় ট্রাম্প কংগ্রেসের কোনো পূর্বানুমোদন নেননি। মার্কিন যুদ্ধক্ষমতা আইন বা ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন ১৯৭৩’ অনুযায়ী, কংগ্রেসের সবুজ সংকেত না থাকলে যেকোনো সামরিক অভিযান শুরুর ৬০ দিন পর প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়।
তবে এই আইনগত বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প তাঁর চিঠিতে নতুন যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর এই নতুন হামলা মূলত দেশে এবং বিদেশে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার জন্য নেওয়া হয়েছে, যা একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন করে এই সংঘাত শুরুর ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরও ৬০ দিনের বৈধ সময় পেয়ে যাবে।
এর আগে গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছিলেন যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের প্রাথমিক মার্কিন সামরিক অভিযানটির সমাপ্তি ঘটে। পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক মোড় নেয় যখন গত ১৭ জুন দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকে সই করে। তবে সেই শান্তি স্থায়ী হয়নি। গত সপ্তাহে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হলে সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতি—দুই-ই ভেস্তে যায়। এই চুক্তি ভঙ্গের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরান বরাবরের মতোই একে অপরকে দায়ী করছে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর। গত সোমবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন এখন হরমুজ প্রণালির একক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছে। এটি মূলত ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক ভারতীয় ক্রু সদস্যের মৃত্যু এবং আরও আটজন আহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তাঁর আগ্রাসী পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা ও যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করবে। শুধু তা-ই নয়, এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল বা কর আদায়ের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে আবারও কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করবে। ইরান বা দেশটির কোনো বাণিজ্যিক ক্রেতার কোনো জাহাজকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে আর চলাচল করতে দেওয়া হবে না। ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিল।