খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় হাওর থেকে জব্দ করা নিষিদ্ধ খনা জাল ও নৌকা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ঢুকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজত থেকে সরকারি মালপত্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়ার এই ধৃষ্টতার জেরে ১,১৬৫ জন জেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই এজাহারনামীয় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করেছে। মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান আজ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন মোহনগঞ্জ উপজেলার মাঘান কুড়েরপাড় এলাকার বাসিন্দা জাকির (২২) ও মামুন (২৪)।
পুলিশ ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বিকেলে মোহনগঞ্জ থানার অধীন আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একটি দল উপজেলার বিখ্যাত ডিঙ্গাপোতা হাওরে বিশেষ মৎস্য অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে মৎস্য আইন অমান্য করে মাছ ধরার অপরাধে বিশাল আকৃতির ৪টি নিষিদ্ধ খনা জাল এবং মাছ ধরার ২টি নৌকা জব্দ করেন পুলিশ সদস্যরা। জব্দকৃত একেকটি খনা জালের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৫০০ ফুট। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ জব্দ করা এসব জাল ও নৌকা আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র প্রাঙ্গণে এনে হেফাজতে রাখে।
তবে বিপত্তি ঘটে এর পরদিন। অভিযোগ রয়েছে, গত রোববার দুপুরে জব্দকৃত মালামাল ছাড়িয়ে নিতে মাঘান কুড়েরপাড়সহ আশপাশের এলাকার কয়েকশ জেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘবদ্ধ হন। তারা আচমকা আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে চড়াও হয়ে হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বাধা উপেক্ষা করে তদন্ত কেন্দ্রের ভেতর থেকে জব্দ করা নিষিদ্ধ খনা জাল ও নৌকাগুলো জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে চলে যান। পুলিশের হেফাজত থেকে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে মালামাল ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। পরবর্তীতে সোমবার পুলিশ পুনরায় হাওরের বিভিন্ন পয়েন্টে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ছিনতাই হওয়া ৪টি জালের মধ্যে ১টি খনা জাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
সরকারি কাজে বাধা দান এবং পুলিশ হেফাজত থেকে মালামাল ছিনতাইয়ের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় গত সোমবার রাতে আদর্শনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাসেল পারভেজ বাদী হয়ে মোহনগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় দায়ের করা এই মামলায় ৬৫ জন জেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১,১০০ থেকে ১,২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাহমুদুল হাসান বলেন, “পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি সম্পত্তি ছিনতাইয়ের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। মামলায় নাম থাকা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আজই আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুতই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন টুকু এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের বিশেষ উদ্যোগে মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর হাওরাঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রায় ৭৫ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। পোনা মাছগুলো যেন ঠিকমতো বড় হতে পারে, সেই লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে স্থানীয় জেলেদের সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক উপায়ে বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে স্থানীয় জেলেদের একাংশের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, সরকারি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ গত ২৮ জুনই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। ফলে হাওরে প্রাকৃতিক উপায়ে মাছ ধরার বৈধ অধিকার তারা ফিরে পেয়েছেন। এই যুক্তিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে আরোপিত অতিরিক্ত এই বিধিনিষেধ মানতে তারা অনীহা প্রকাশ করছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকেই হাওরাঞ্চলের সাধারণ জেলে ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মধ্যে বেশ কয়েক দফা উত্তেজনা ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ছিনতাইয়ের মধ্য দিয়ে।
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, হাওরের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং দেশীয় মাছের বংশবিস্তার নিশ্চিতে কোনো আপস করা হবে না। কারেন্ট ও খনা জালের মতো ক্ষতিকারক ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট ও পুলিশের এই কঠোর অভিযান আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।