চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার একটি লবণ কারখানায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ দুই শ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এই দুর্ঘটনায় আরও নয়জন শ্রমিক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউ ও বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঘটনাটি শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দিন মজুমদার শুক্রবার (১৭ জুলাই) জানান, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাতের দিকে হাসপাতালের আইসিইউ ও বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন পটিয়া উপজেলার হুলাইন এলাকার ইয়াসিন আউলিয়ার মাজার বাড়ির মোহাম্মদ আলম এবং বোয়ালখালীর বদন আলীর বাড়ির দিদারুল আলম।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর প্রায় ১২টার দিকে বোয়ালখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম গোমদণ্ডীতে অবস্থিত কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেড কারখানায় বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে মোট ১১ জন শ্রমিক দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে এবং চারজনকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। আরও দুজন প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান।
দগ্ধ শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন বোয়ালখালীর দিদারুল আলম, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন ও নূর নবী; রাঙ্গুনিয়ার উজ্জ্বল দাশ; নগরের সদরঘাট এলাকার মোহাম্মদ লিটন; লোহাগাড়ার সিরাজুল ইসলাম; রাউজানের জাহিদুল আলম; পটিয়ার মোহাম্মদ আলম; মাহমুদুল হক; এবং চন্দনাইশের সেলিম উদ্দিন ও আহসানুল হক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত দিদারুল আলমের শরীরের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং মোহাম্মদ আলমের শরীরের প্রায় ৬৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। আহতদের মধ্যে মাহমুদুল হকের ৬০ শতাংশ, উজ্জ্বল দাশের ৫০ শতাংশ, নূর নবীর ৪৫ শতাংশ, মোহাম্মদ লিটনের ৪০ শতাংশ, জাহিদুল আলমের ৩৫ শতাংশ, সেলিম উদ্দিনের ২০ শতাংশ এবং জাহিদ হোসেন ও সিরাজুল ইসলামের শরীরের প্রায় ১০ শতাংশ করে দগ্ধ হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর দগ্ধ রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থার ওপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে।
ঘটনার প্রাথমিক কারণ সম্পর্কে বোয়ালখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাফফর হোসেন জানান, কারখানার একটি বড় জেনারেটরসহ কয়েকটি যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো মেরামতের জন্য পাঁচটি ওয়েল্ডিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছিল। একসঙ্গে একাধিক ওয়েল্ডিং মেশিন চালানোর ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎচাপের কারণে ভোল্টেজ ওঠানামা করে। সেই পরিস্থিতিতে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং পরে সেখানে থাকা দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকরা ভয়াবহভাবে দগ্ধ হন।
ওসি আরও জানান, নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে অবস্থান করায় তাদের বাসায় পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কেউ অভিযোগ বা মামলা করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোয়ালখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন লিডার মোহাম্মদ আজাহার বলেন, খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়ভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে জানানো হলে তারা ফিরে আসেন। ফলে আগুন নেভানোর কাজে তাদের সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি।
এদিকে দুর্ঘটনা নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোনে সাড়া মেলেনি।
এই দুর্ঘটনার পর শিল্পকারখানায় বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ মেরামতকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি।