খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় পানিতে ডুবে চার শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। হৃদয়বিদারক এ ঘটনার পর একই জানাজায় চার শিশুর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পার্শ্ববর্তী সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়। কিন্তু সেই শোক কাটতে না কাটতেই পরদিন একই উপজেলায় মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্বেগ ও বেদনা আরও গভীর হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রায়পুরা উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে চার শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুলসংখ্যক গ্রামবাসী, আত্মীয়স্বজন, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে বড়কান্দা গ্রামের পাশের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা চার শিশুর শেষ বিদায়ও হলো একসঙ্গেই।
নিহতরা হলো বড়কান্দা গ্রামের শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), রুবেল মিয়ার মেয়ে আয়েশা (৯), মো. রুবেলের মেয়ে জান্নাত (৮) এবং বিল্লাল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)। তারা সবাই স্থানীয় গাউসিয়া নুরে মদিনা মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা একসঙ্গে গ্রামের একটি খালে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে গভীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে চারজনই মারা যায়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা উদ্ধার অভিযান চালালেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
চান্দেরকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন খন্দকার মিতুল জানান, চার শিশুর বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় তারা সব সময় একসঙ্গে খেলাধুলা করত এবং একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করত। জীবনের মতো মৃত্যুতেও তারা একসঙ্গে বিদায় নিয়েছে। স্থানীয়দের সিদ্ধান্তেই একসঙ্গে জানাজা এবং পাশাপাশি দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
সরেজমিনে পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত চার শিশুর পরিবারই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। আয়েশার বাবা রুবেল মিয়া বিভিন্ন বাজারে কলা বিক্রি করে সংসার চালান। জান্নাতের বাবা মো. রুবেল রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। আর সুমাইয়ার বাবা বিল্লাল মিয়া বিভিন্ন ধরনের শ্রমনির্ভর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুকনো মৌসুমে খালটিতে প্রায় পানি থাকে না। কিন্তু বর্ষাকালে সেটি দ্রুত গভীর হয়ে যায়। চার শিশুর কেউই সাঁতার জানত না। পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তারা গোসল করতে খালে নেমেছিল।
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাবিয়ার বাবা শামীম মিয়া। তিনি জানান, কাজের উদ্দেশ্যে ট্রেনে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বাড়ি থেকে ফোনে জানতে পারেন তার মেয়ে পানিতে ডুবে গেছে। হাসপাতালে পৌঁছে তিনি মেয়ের নিথর দেহ দেখতে পান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তার একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। কীভাবে মেয়েটি খালে গেল, সেটিই এখনো তার কাছে অবিশ্বাস্য।
অন্যদিকে, আয়েশার বাবা রুবেল মিয়া বলেন, অভাবের সংসারে মেয়ের হাসি আর দুষ্টুমিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। সেই মুখ আর কোনো দিন দেখতে পারবেন না—এই বাস্তবতা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত না করার আবেদন করায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চার শিশুর মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক শিশুর পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় এবং লিখিত আবেদন পাওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার সকাল গড়াতেই রায়পুরায় আবারও ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা। বেলা ১১টার দিকে উপজেলার চরাঞ্চলের শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ গ্রামের ভেলুয়ারচর এলাকায় মেঘনা নদীতে গোসল করতে নেমে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়। নিহতরা হলো ভেলুয়ারচর এলাকার নুরুজ্জামানের মেয়ে জান্নাতি আক্তার (৮) এবং সাদ্দাম মিয়ার মেয়ে নিপা আক্তার (৭)।
এক দিনের ব্যবধানে একই উপজেলায় পানিতে ডুবে ছয় শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের পাশাপাশি উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বর্ষাকালে খাল, নদী ও জলাশয়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিশু সাঁতার জানে না, তাদের জলাশয়ের আশপাশে একা যেতে না দেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।