কল্যাণপুরে যুবক হত্যা: দীর্ঘ ২১ বছর পর দুই ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ড

রাজধানীর কল্যাণপুরে সংঘটিত একটি বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর অবশেষে রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় শফিকুল আলম ওরফে শফিক নামে এক সম্ভাবনাময় শিক্ষিত যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অপরাধে দুই ছিনতাইকারীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন।

আজ রবিবার (১৯ জুলাই) ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের বিচারক মোসাদ্দেক মিনহাজ চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর খলিলুর রহমান খলিল রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিই পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ কঠোর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো— সোহেল রানা ওরফে কালু এবং নাজিম উদ্দিন ওরফে নাজিম ওরফে নজু। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা প্রত্যেকেই পেশাদার ও দুর্ধর্ষ অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ বিভিন্ন থানায় অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং মাদক আইনের একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একজন নিরপরাধ ও শিক্ষিত তরুণকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে যেভাবে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে, তাতে আসামিরা কোনোভাবেই অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নয়। সমাজ থেকে এই ধরনের অপরাধ নির্মূল করতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

আদালতে পেশ করা মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালের ২২ জুন ভোর সোয়া ৪টার দিকে বগুড়া থেকে এস আর পরিবহনের একটি বাসে চড়ে ঢাকায় আসেন ভুক্তভোগী যুবক শফিক। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে নামার পর তিনি পায়ে হেঁটে এক বন্ধুর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে এশিয়া সিনেমা হলের সামনে পৌঁছালে তিন জন সশস্ত্র ছিনতাইকারী তার পথরোধ করে দাঁড়ায়। ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে শফিকের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

সে সময় শফিক বাধা দিলে অপরাধীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শফিক রক্তাক্ত ও মারাত্মক জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নিহতের বাবা মো. আকবর আলী বাদী হয়ে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে অন্যতম মূল আসামি মো. সোহেল রানা ওরফে কালুকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। তবে পরবর্তীতে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর সে আত্মগোপনে চলে যায়।

মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে ২০০৬ সালের ৫ এপ্রিল মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৯ জনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপন করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জবানবন্দি পর্যালোচনা শেষে আদালত আজ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করলেন। ভুক্তভোগী পরিবার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।