স্মরণে—লোকসাহিত্যের অমূল্য রত্নভান্ডারের রূপকার মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন

যাঁর সাধনায় লোকজীবনের গান পেয়েছে অমরত্ব

বাংলার মাটি, মানুষ, জনপদ আর লোকজীবনের অন্তর্গত সুরকে যাঁরা ভালোবেসে সংগ্রহ করেছেন, যাঁদের সাধনায় গ্রামবাংলার মুখে মুখে ফেরে এমন অসংখ্য গান ও লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, তাঁদের মধ্যে মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন এক উজ্জ্বল ও স্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট লোকসাহিত্য সংগ্রাহক, লোকসংগীত গবেষক ও সাহিত্যবিশারদ। তাঁর নিরলস সাধনা ও গভীর অনুরাগে বাংলার লোকঐতিহ্য পেয়েছে এক সমৃদ্ধ সংরক্ষণভান্ডার।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন ১৯০৪ সালে পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মুরারিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জায়দার আলী এবং মাতা জিউয়ারুন নেসা।

শৈশব থেকেই মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু মনসুর উদ্দিন শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯২১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯২৬ সালে বিএ পাস করেন এবং ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলার্সে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তিনি তৎকালীন শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও তাঁর জীবনে চলছিল আরেকটি গভীর সাধনা—বাংলার লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের হারিয়ে যেতে বসা সম্পদ সংগ্রহের সাধনা।

লালনের গানে লোকসাহিত্যের পথে যাত্রা

দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত লালনের গান পড়ে তাঁর মনে লোকসাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। সেই গানগুলোই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে বাংলার মাটিতে ছড়িয়ে থাকা বাউল-ফকিরদের গান ও লোকজ ঐতিহ্য সংগ্রহে আত্মনিয়োগ করতে।

পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকেও তিনি প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা লাভ করেন।

তাঁর সংগৃহীত প্রথম গানটি ছিল নিজ গ্রাম মুরারিপুরের প্রেমদাস বৈরাগীর কাছ থেকে পাওয়া লালনের একটি গান। গানটি তিনি পাঠিয়ে দেন প্রবাসী পত্রিকায়, যা ১৩৩০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সেই সূচনা থেকেই ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে তাঁর জীবনব্যাপী লোকসাহিত্য সংগ্রহের মহৎ কর্মযজ্ঞ।

হারামণি: বাংলার লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ

মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তিগুলোর একটি হলো হারামণি। ত্রয়োদশ খণ্ডে প্রকাশিত এই সংগ্রহে সংরক্ষিত হয়েছে বাংলার লোকসংগীতের অসংখ্য অমূল্য নিদর্শন। বাউল, ফকির ও সাধক-গীতিকারদের কণ্ঠে বেঁচে থাকা গানগুলোকে তিনি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের মাধ্যমে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

তাঁর এই সাধনা কেবল গান সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনবোধ, প্রেম, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবোধ ও আত্মঅন্বেষণের বহুমাত্রিক প্রকাশ।

তাঁর রচিত বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা গ্রন্থটি তিন খণ্ডে বিভক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম। সব মিলিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪২টি বলে উল্লেখ করা হয়। এসব রচনা ও সংগ্রহ বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

কর্মজীবন ও জীবনদর্শন

১৯৩১ সালে স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর পদে সরকারি চাকরিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে সরকারি মাসিক পত্রিকা মাহে নও-এর সম্পাদক হিসেবেও ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন।

জীবনের কয়েক দশক তিনি রাজধানী ঢাকায় কাটিয়েছেন। তাঁর জীবনযাপনে ছিল নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য—হুঁকোবিলাস, জুতা ও ইংরেজির প্রতি অনুরাগ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল আরও ব্যাপক, আরও গভীর। তিনি ছিলেন এক উদার, অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্বমানবিক চেতনার মানুষ। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে তাঁর ছিল নিবিড় যোগাযোগ। তাঁদের জীবন, সাধনা ও গানের ভেতরেই তিনি খুঁজে ফিরেছেন বাংলার মানুষের অন্তর্লীন সত্য ও সৌন্দর্য।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

লোকসাহিত্য, সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশে-বিদেশে নানা সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন।

– ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
– ১৯৭৬ সালে একুশে পদক।
– ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার।

এসব সম্মাননা তাঁর দীর্ঘ সাধনা ও সৃজনশীল কর্মের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বহন করে।

প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার

১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এই মহান লোকসাহিত্য সংগ্রাহক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শারীরিক প্রয়াণ ঘটেছে, কিন্তু বাংলার লোকজীবনের গান ও সাহিত্যকে ঘিরে তাঁর সাধনার যে বিস্তৃত উত্তরাধিকার, তা আজও অমলিন।

যে গান একদিন হয়তো হারিয়ে যেত কোনো অজানা গ্রামের পথে, কোনো বাউল-ফকিরের কণ্ঠে কিংবা কোনো নিভৃত সাধকের স্মৃতির সঙ্গে—মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের নিষ্ঠা ও শ্রমে সেই গানগুলো পেয়েছে সংরক্ষণের আশ্রয়, পেয়েছে নতুন জীবনের আলো।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, লোকসাহিত্য কোনো অবহেলিত প্রান্তিক সম্পদ নয়; তা একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও হৃদয়ের ভাষা। বাংলার লোকঐতিহ্যকে ভালোবেসে, তার অমূল্য সম্পদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সযত্নে তুলে রেখে তিনি হয়ে আছেন আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য সাধক।

লোকসাহিত্যের এই নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রাহকের প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ।

তাঁর সংগ্রহ ও সাধনার আলোয় বাংলার লোকসংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকুক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।