খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
চুয়াডাঙ্গায় এক শিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় একমাত্র আসামি আবুল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ঘটনার দীর্ঘ আড়াই বছর পর আজ সোমবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোক্তাগীর আলম এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কঠোর পুলিশি পাহারায় জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, সেদিন দুপুরে ভুক্তভোগী শিশুটিকে শাক তুলে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় একটি ভুট্টাখেতে নিয়ে যান আসামি আবুল হোসেন। সেখানে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। নৃশংসতার এখানেই শেষ ছিল না; নিজের অপরাধ ঢাকতে শিশুটিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করেন তিনি। পরবর্তীতে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে শিশুটির মা ও প্রতিবেশীরা ভুট্টাখেতের ভেতর তার রক্তাক্ত ও গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা জানাজানি হলে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনার পর পরই নিহতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে জীবননগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা জীবননগর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) সাইফুল ইসলাম আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের আবু তাহের মোল্লার ছেলে আবুল হোসেন ওরফে ফটিককে (২৯) একমাত্র অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর আসামি আবুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। কীভাবে তিনি শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যান এবং কীভাবে তাকে হত্যা করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দেন এই জবানবন্দিতে। এ ছাড়া মামলার তদন্তকে নিশ্ছিদ্র করতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর জোর দেয় পুলিশ। ল্যাবে পাঠানো নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টও আসামির বিরুদ্ধে পজিটিভ আসে। বৈজ্ঞানিক এই তথ্যপ্রমাণ ও আসামির নিজের স্বীকারোক্তি মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষ আসামির অপরাধ প্রমাণে কোনো খামতি রাখেনি। এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দি গ্রহণ করেন। চিকিৎসক, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ সত্য।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এমএম শাহজাহান মুকুল এই রায়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “এই রায় সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অপরাধী যে পার পায় না, তা আবারও প্রমাণিত হলো। আমরা আশা করি দ্রুত এই রায় কার্যকর হবে।” অন্যদিকে আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে মামলাটি পরিচালনা করেন আইনজীবী ওহিদুজ্জামান মুকুল। অবুঝ এক শিশুকে হারিয়ে যে পরিবারটি আড়াই বছর ধরে বিচারের আশায় দিন গুনছিল, আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো।