খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আদালতের আদেশ অবহেলা করার এই ধারাবাহিকতায় চরম আর্থিক অনটন, চিকিৎসা সংকট ও গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার। জীবনের শেষ সম্বল ও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা এখন দিশেহারা।
সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা জানান ভুক্তভোগীরা। ‘গ্রামীণ ব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি’ আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে অবিলম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই বঞ্চনার অবসান ঘটাতে সরকার ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কে এম শহীদুল হক। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের আইনি কাঠামোর বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী, সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ত ও সংবিধিবদ্ধ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের এসব আইনি ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে।
বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট পিটিশন (যার নম্বর ৯৫২৬/২০২১ এবং ৬৭৬৫/২০২১) দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট তাদের অনুকূলে রায় দেন। পরবর্তীতে গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে এই রায়ের বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্তদের পুনঃ পেনশন চালুকরণসহ বকেয়া উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা অবিলম্বে পরিশোধের জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্র স্বীকৃত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সরকার কর্তৃক ঘোষিত যেকোনো ধরনের আর্থিক প্রণোদনা বা সুবিধা কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রশাসনের অসংবেদনশীল মনোভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ২০০৪ সালের উৎসব ও চিকিৎসা ভাতা এবং ২০১৮ সালের পুনঃ পেনশন সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনেক আগেই বাস্তবায়ন করেছে। অথচ রহস্যজনক ও অজানা কারণে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সরকারের এই কল্যাণমুখী সিদ্ধান্তগুলো যুগের পর যুগ ঝুলিয়ে রেখেছে। ১৯৯৪ সালে বিতর্কিত ‘স্বেচ্ছা অবসর’ কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বক্তারা বলেন, সে সময় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কার্যত জোরপূর্বক অবসরে পাঠাতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা তাদের পেশাগত ও সামাজিক জীবনকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল।
বর্তমানে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর এক মাস গড়ালেও ব্যাংক প্রশাসন নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও তহবিল সংকটের দোহাই দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভুক্তভোগীরা জানান, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিয়মিত চিকিৎসার খরচ চালাতে না পেরে অনেকেই আজ চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। সময়মতো ওষুধ কিনতে না পেরে বা উন্নত চিকিৎসা নিতে না পেরে অনেকের জীবনই এখন থমকে যাওয়ার উপক্রম।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্পষ্ট বার্তা—যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতের নির্দেশনা মেনে পাওনা পরিশোধ করা না হয়, তবে আগামীতে তারা মহাসমাবেশ, অবস্থান ধর্মঘটসহ আরও কঠোর আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবেন।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সহসভাপতি হাবিবুল ইসলাম, উপদেষ্টা গোলাম মাওলা, মহাসচিব অ্যাডভোকেট সিদ্দিকুর রহমান এবং অর্থ সম্পাদক আবু মোহাম্মদ মতিউর রহমানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।