খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয়নি, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর ছিল এই মহারণে। আর সেই উত্তেজনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় আমেরিকার সুপার বোলের আদলে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ হাফটাইম শো। এক মঞ্চে হাজির হয়ে ইতিহাস গড়েছেন পপসম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা, লাতিন তারকা শাকিরা, কানাডীয় গায়ক জাস্টিন বিবার ও বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন জনপ্রিয় সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’র তারকা জেসন সুডেইকিস, ব্রেন্ডন হান্ট এবং জনপ্রিয় শিশুতোষ চরিত্র ‘দ্য মাপেটস’।
এত বড় বড় আন্তর্জাতিক তারকার উপস্থিতি দেখে সাধারণ দর্শকের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এ জন্য তাঁরা কত কোটি ডলার পারিশ্রমিক পেয়েছেন? কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া মঞ্চে গান গেয়ে কোনো শিল্পীই এক ডলারও পারিশ্রমিক নেননি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাঁরা এই আয়োজনে পারফর্ম করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ৪৮ দলের এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপে প্রথাগত আমেরিকান ক্রীড়া সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা যোগ করতে চেয়েছিল ফিফা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) বহুল জনপ্রিয় ‘সুপার বোল হাফটাইম শো’ অনুসরণে এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। সেখানে বহু বছর ধরে মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স, বেয়ন্সে, রিহানা কিংবা লেডি গাগার মতো বড় বড় তারকারা পারফর্ম করে এসেছেন। সেই ধারাই এবার জায়গা করে নিল বিশ্ব ফুটবলে।
তবে মাঠের উত্তেজনার পাশাপাশি এই অনুষ্ঠান নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ছিল কিছুটা ধীরগতির। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেন ২-১ ব্যবধানে শিরোপা উঁচিয়ে ধরে। কিন্তু খেলার মূল আকর্ষণকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে ২৭ মিনিটের দীর্ঘ বিরতি। সাধারণত ফুটবলে ১৫ মিনিটের বিরতি থাকলেও এই সংগীতানুষ্ঠানের কারণে বিরতি দ্বিগুণ সময় নেয়। খেলা চলাকালে এমন দীর্ঘ বিরতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষক ওয়েন রুনি খোলাখুলি জানান, শিল্পীদের পছন্দ করলেও ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ছন্দ নষ্ট করে এমন আয়োজন তিনি সমর্থন করেন না।
এমনিতে শাকিরা, জাস্টিন বিবার কিংবা বিটিএসকে একক কনসার্ট বা ব্যক্তিগত আয়োজনে আনতে আয়োজকদের কোটি কোটি ডলার গুনতে হয়। তবে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া মাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে, বিশ্বকাপের হাফটাইম শোতে অংশ নেওয়া তারকাদের কাউকেই পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি।
এই নিখরচায় পারফর্ম করার পেছনে ছিল একটি বৈশ্বিক সামাজিক উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ‘গ্লোবাল সিটিজেন’-এর সঙ্গে ফিফার যৌথ সামাজিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এটি আয়োজিত হয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও ফুটবল খেলার সুযোগ সম্প্রসারণে ‘ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ড’-এর বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতেই শিল্পীরা স্বেচ্ছায় এতে অংশ নেন। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আগেই জানিয়েছিলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ফুটবল ম্যাচটিকে স্রেফ একটি খেলায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষা, মানবতা ও বিশ্ব ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। সুপার বোলের মতো ফিফাও প্রযোজনা ব্যয় বহন করলেও শিল্পীদের বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি দর্শকের সামনে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।