খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে নির্মাণাধীন একটি গ্রামীণ সেতুতে ঢালাই কাজ চলাকালে সাটারিংসহ অবকাঠামোর একাংশ খালের মধ্যে ভেঙে পড়েছে। প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটির নির্মাণকাজে চরম অবহেলা ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধসের ফলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং নির্মাণ তদারকি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত আহম্মেদকাঠী গ্রামের মৃধাবাড়ির সংলগ্ন খালের ওপর। গত ২২ জুলাই (বুধবার) দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি চলাকালেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকেরা সেতুটিতে কংক্রিটের ঢালাইয়ের কাজ করছিলেন। ঠিক তখনই মূল কাঠামোর নিচ থেকে শব্দ হয়ে সাটারিংসহ সেতুর বড় একটি অংশ খালের পানির মধ্যে তলিয়ে যায়।
পরদিন ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন কাঠামোর প্রায় অর্ধেক অংশ খালের পানিতে ভেঙে ভেঙে ভেসে আছে। যেটুকু অংশ অক্ষত ছিল, তা-ও বৃষ্টিতে ভিজে কাঁচা কংক্রিট ধুয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢালাইয়ে থাকা দুই নির্মাণশ্রমিক আবু তালেব ও তার সহযোগী জানান, নিচের পাটাতন ও বাঁশের ফ্রেম দুর্বল থাকায় চাপ সহ্য করতে না পেরে পুরো অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। তারা দুজন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মূল সেতুর নিচে সাটারিং তৈরিতে পুরোপুরি নিম্নমানের, ঘুনে ধরা ও পুরোনো বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছিল। নদীর বা খালের পানির স্রোত ও কংক্রিটের ওজনের কথা মাথায় না রেখে অত্যন্ত দুর্বল কাঠ ও পাটাতন দিয়ে এই ঢালাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি প্রকল্পের তদারকি না থাকা এবং তড়িঘড়ি করে বৃষ্টি চলাকালীন সময়ে কাজ করার কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে।
গৌরনদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূল দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় ‘ডায়নামিক আইটি শপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা নিজস্ব উদ্যোগে কাজ না করে ঠিকাদার আবুল ফয়েজ শরীফের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করে।
ঘটনাস্থল ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঠিকাদার আবুল ফয়েজ শরীফ নিজের ভুল মেনে নিয়ে জানান, “নিচের সাপোর্ট স্ট্রাকচার শক্ত না থাকায় সাটারিং লোড সামলাতে পারেনি। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন করে মজবুত সাটারিং বানিয়ে পুনরায় ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করব।”
তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) খোকন চন্দ্র দাস তদারকির অভাবেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্বীকার করেন না। তিনি জানান:
“আমাদের দপ্তরকে কোনো তথ্য না দিয়ে কিংবা উপস্থিতি ছাড়াই ঠিকাদার নিজেদের ইচ্ছেমতো ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেছিলেন। বিষয়টি জানার পরপরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহিম এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার কথা উল্লেখ করে বলেন:
“পুরো ঘটনাটি খুব গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কাজের মানহীনতা, ত্রুটি বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি পুনরায় মানসম্মতভাবে নির্মাণ করানো হবে।”
প্রত্যন্ত আহম্মেদকাঠী গ্রামের দীর্ঘদিনের চলাচলের সমস্যা সমাধানের জন্য সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুরুতেই এমন ধসের ঘটনায় পুরো সেতুটির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন একে দিয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের জোর দাবি, শুধু পুনর্নির্মাণ নয়—সরকারি অর্থের অপচয় রোধে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।