খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
কিশোরগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাস্থলে মরদেহ উদ্ধার করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার এক পুলিশ সদস্য জানতে পারেন, নিহত শিশুটি আর কেউ নয়—তারই নিজের ছেলে। হৃদয়বিদারক এ ঘটনা শুধু পরিবার নয়, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদেরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
শুক্রবার সকাল প্রায় ১০টা ২০ মিনিটে কিশোরগঞ্জ শহরের গাইটাল এলাকায় আবদুল ওয়াহেদ জনতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত তুহিন (১০) ওই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কনস্টেবল সামসুল কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় কর্মরত। পরিবারের গ্রামের বাড়ি পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে তুহিন বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক পার হওয়ার সময় একটি দ্রুতগতির ট্রাক তাকে চাপা দেয়। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে নিয়মিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলে যান কনস্টেবল সামসুল। তখনও তিনি জানতেন না যে, যে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি সেখানে যাচ্ছেন, সেটি তার নিজের সন্তানের।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহের কাছে গিয়ে তিনি যখন সন্তানের মুখ দেখতে পান, তখনই পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। মুহূর্তেই তিনি শোকে ভেঙে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। সহকর্মী পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। উপস্থিত অনেকেই জানান, একজন বাবার সামনে নিজের সন্তানের এমন নির্মম পরিণতি প্রত্যক্ষ করা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি মুহূর্ত, যা সেখানে উপস্থিত সবার হৃদয় স্পর্শ করে।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, কনস্টেবল সামসুল থানার একজন দায়িত্বশীল সদস্য। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর তিনি অন্য দিনের মতোই দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে যান। পরে সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, নিহত শিশুটি তার নিজের ছেলে। ঘটনাটি থানার সব সদস্যের জন্যই অত্যন্ত শোকাবহ ও বেদনাদায়ক।
তিনি আরও জানান, নিহত তুহিনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকটি পুলিশ জব্দ করেছে। তবে চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছে। তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখনও একটি বড় জননিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা এবং চালকদের সতর্কতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। শিশুদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি সবার দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, দায়িত্ব পালনরত একজন পুলিশ সদস্যেরও পরিচয়ের আগে তিনি একজন বাবা। আর সেই বাবার চোখের সামনে নিজের সন্তানের নিথর দেহ দেখতে হওয়ার মতো বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা যে কতটা অসহনীয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।