খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের বিপক্ষে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজকে অস্ট্রেলিয়া যে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছে না, তাদের ঘোষিত দলেই তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে নিয়মিত অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি অভিজ্ঞ পেসার জশ হ্যাজলউড ও অফ-স্পিনার নাথান লায়নের দলে ফেরাকে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তাঁর মতে, শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে সিরিজ খেলতে আসার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সম্মান এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বেরই প্রতিফলন।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্যতম শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই ম্যাচের হোম সিরিজ খেলবে ডারউইন ও ম্যাকেতে। সিরিজের আগে ঘোষিত দলে অভিজ্ঞ ও নিয়মিত ক্রিকেটারদের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য যেমন কঠিন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের একটি বড় সুযোগও তৈরি করছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে বাংলাদেশের ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রয়োজন হবে।
শুক্রবার নতুন কুঁড়ি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল শেষে মিরপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাজমুল। সেখানেই অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচন নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক।
নাজমুল বলেন, অস্ট্রেলিয়ার এমন দল নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে আসার ঘটনা তিনি আগে খুব একটা দেখেননি। বড় দলগুলো অনেক সময় তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে বিভিন্ন ক্রিকেটারকে বিশ্রাম দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে। কিন্তু এবার অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে নিয়মিত ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপস্থিতি দেখাচ্ছে, তারা সিরিজটিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
বাংলাদেশ অধিনায়কের ভাষায়, ‘এরকম এর আগে আমি কখনো দেখিনি। আমাদের দলের সঙ্গে খেলার সময় হয়তো অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে থাকে। বিশেষ করে বড় দলগুলো করে। আমি বলব, দল হিসাবে এটা একটা অর্জন আমাদের। তারা এই সিরিজ হালকাভাবে নেয়নি।’
নাজমুলের এই মন্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। গত জুনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে অস্ট্রেলিয়া পূর্ণশক্তির দল নিয়ে মাঠে নামেনি। সেই সফরের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের কাছে হারতেও হয়েছিল সফরকারীদের। এবার অবশ্য টেস্ট সিরিজের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিয়মিত ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অন্তর্ভুক্ত করে দল সাজানোয় অস্ট্রেলিয়া যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামতে প্রস্তুত, সেটিই ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সিরিজকে তাই কেবল আরেকটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ হিসেবে দেখছেন না নাজমুল। তাঁর চোখে এটি নিজেদের টেস্ট ক্রিকেটের মান যাচাইয়ের বড় সুযোগ। বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে নিজেদের পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, চাপের মধ্যে ব্যাটাররা কতটা দায়িত্ব নিতে পারেন এবং বোলাররা কতটা শৃঙ্খলিত থাকতে পারেন—এসবই সিরিজে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠবে।
নাজমুল বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুযোগ। বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে আমরা কতটা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি, সেটাই এখন দেখানোর সময়। প্রতিপক্ষের স্কোয়াড দেখলেই বোঝা যায়, তারা সিরিজটি হালকাভাবে নেয়নি। আমাদের নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে।’
তবে সিরিজের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা উদ্বেগের জায়গা হয়ে আছে চোট সমস্যা। দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই ক্রিকেটার লিটন দাস ও নাহিদ রানার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিজিও ও মেডিকেল টিমের রিপোর্টকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অধিনায়ক।
নাজমুল বলেন, ‘ওদের ইনজুরি নিয়ে ফিজিও ও মেডিকেল টিম কাজ করবে। তাদের রিপোর্টের ওপর সব কিছু নির্ভর করবে। এর বাইরে আমাদের কিছু বলার নেই।’
চোটের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের আগে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য থাকবে প্রস্তুতি ও মানসিক দৃঢ়তা। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো করতে হলে নিজেদের ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি প্রতিটি সেশনে পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রিকেট খেলতে হবে। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা এবং সুযোগ কাজে লাগানোই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এদিকে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী নাজমুল। নতুন কুঁড়ি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মতো আয়োজন থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক বিষয়। রাজশাহীর ক্রিকেট অবকাঠামোর প্রশংসা করে তিনি জানান, সেখানে ক্রিকেট নিয়ে নিয়মিত কাজ হচ্ছে এবং একাডেমিগুলোও তরুণদের জন্য ভালো সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।
নাজমুল বলেন, ‘অবশ্যই এখান থেকে জাতীয় দলে ক্রিকেটার আসতে পারে। সেটা হলে খুবই ভালো হবে। রাজশাহী কিংবা দেশের যে কোনো জায়গা থেকে খেলোয়াড় আসুক, সেটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক।’
রাজশাহীর ক্রিকেট কাঠামো নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীতে ক্রিকেট নিয়ে অনেক কাজ হয়। একাডেমিগুলোও ভালো সুযোগ-সুবিধা দেয়। এই সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে সেখান থেকে আরও বড় বড় ক্রিকেটার উঠে আসবে।’
জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্তিশালী করতে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার গুরুত্বও এই বক্তব্যে উঠে এসেছে। একটি শক্তিশালী জাতীয় দল গড়ে তুলতে শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাফল্য নয়, বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিভা খুঁজে বের করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়াও জরুরি। নাজমুলের মন্তব্যে সেই দীর্ঘমেয়াদি ভাবনারই প্রতিফলন দেখা যায়।
এদিকে মিরপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানাকেও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। একই দিনে পুরুষ ও নারী ক্রিকেটের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে তরুণ প্রতিভা বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার তৈরির গুরুত্বকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণশক্তির দল বাংলাদেশের সামনে কঠিন পরীক্ষার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে নাজমুল হোসেন শান্তর দৃষ্টিতে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় সুযোগ। অস্ট্রেলিয়া যদি সিরিজকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্যও নিজেদের টেস্ট সামর্থ্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে। এখন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারাটাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।