খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
জীবন বিমার অর্থ পরিশোধ না করে গ্রাহকের সাথে প্রতারণার চেষ্টা ও চরম হয়রানির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। চার বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করা বিমা গ্রাহকের মনোনীত উত্তরাধিকারী (নমিনি) তার ন্যায্য ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। ৪৪ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে বিমা প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের নমিনিকে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি রফা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
রবিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই আশঙ্কাজনক অভিযোগ তুলে ধরেন বগুড়ার শান্তাহারের বাসিন্দা মরহুম বিমা গ্রাহক জালাল হোসেনের কন্যা ও মনোনীত নমিনি মোছা. চুমকি আক্তার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে চুমকি আক্তার জানান, তার বাবা জালাল হোসেন মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সে একটি জীবন বিমা পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। ২০২২ সালে তিনি মাসিক প্রায় ২২ হাজার টাকা করে পরপর দুটি কিস্তি পরিশোধ করার পর আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী নমিনি হিসেবে তিনি মেটলাইফের নির্ধারিত সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি উত্তোলন করার আবেদন করেন। তবে আবেদন জমা দেওয়ার পর মেটলাইফ কর্তৃপক্ষ একটি চিঠি পাঠিয়ে দাবি নাকচ করে দেয়। চিঠিতে তারা দাবি করে, পলিসি গ্রহণের সময় নাকি ভুল তথ্য প্রদান করা হয়েছিল, তাই চুক্তি অনুযায়ী এই বিমা দাবি পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
চুমকি আক্তার অভিযোগ করেন, তার বাবার একই সময়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বিমা ও সঞ্চয় সুবিধা ছিল। মরহুম জালাল হোসেনের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে ‘গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ এবং ‘সোনালী ব্যাংক’-এর বিমা ও সঞ্চয়ী অর্থ কোনো প্রকার আইনি জটিলতা বা বিলম্ব ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করা হয়। অথচ কেবল মেটলাইফ কর্তৃপক্ষই অন্যায়ভাবে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ না করার জন্য একের পর এক ভিত্তিহীন জটিলতা ও অজুহাত সৃষ্টি করে চলেছে।
পরবর্তীকালে ন্যায়বিচারের আশায় চুমকি আক্তার আইনজীবী মারফত মেটলাইফকে আইনি নোটিশ (লিগ্যাল নোটিশ) পাঠান। নোটিশ পাঠানোর পর মেটলাইফের মতিঝিল কার্যালয়ে গেলে ‘আলি’ নামের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার সঙ্গে দেখা করেন। উক্ত কর্মকর্তা তাকে আদালতে মামলা না করার জন্য নানাভাবে পরামর্শ ও প্রভাবিত করেন এবং কৌশলে একটি ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। একই সাথে টাকা পরিশোধের কথা বলে তার একটি নতুন ব্যাংক হিসাব নম্বরও জমা নেন।
তবে পরবর্তীতে আইনজীবী ও নথিপত্রের মাধ্যমে চুমকি জানতে পারেন যে, বিমা প্রতিষ্ঠানটি ৪৪ লাখ টাকার মূল বিমা দাবির বদলে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা পরিশোধের চতুর কাগজপত্র প্রস্তুত করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আলির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে জানান, ওই ৪৪ হাজার টাকাই তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে মোছা. চুমকি আক্তার বলেন:
“আমি কখনো ৪৪ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য কোনো সম্মতি দিইনি। এটি ছিল স্রেফ আমার বাবার জমা দেওয়া প্রিমিয়ামের অর্থ। অথচ মেটলাইফ কর্তৃপক্ষ কৌশলে সামান্য প্রিমিয়ামের টাকা ফেরত দিয়ে মূল ৪৪ লাখ টাকার বিশাল বিমা দাবি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও জানান, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে এবং জালিয়াতির বিষয়টি তুলে ধরতে গেলে উক্ত মেটলাইফ কর্মকর্তা তার কাছে থাকা মূল বিমা কাগজপত্র ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। কর্মকর্তা তাকে সোজা জানিয়ে দেন যে, আইনজীবীর মাধ্যমে যা করার করতে। পরবর্তীতে বিমা গ্রাহকের পরিবার থেকে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে গ্রাহকের নম্বরটি ব্লকলিস্টে রেখে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ)-সহ সরকারের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দায়ের করা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান বা প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগে প্রকাশ পায়। সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবার মেটলাইফ এবং কর্মকর্তা আলির বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি ও গ্রাহকের অধিকার হরণের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত ৪৪ লাখ টাকার ন্যায্য বিমা দাবি আদায়ে আইনগত ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।