খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় স্বামীকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে খালের পানিতে ডুবে এক নবদম্পতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রথমে গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে যান স্বামী। তাঁকে বাঁচানোর জন্য স্ত্রীও খালে নেমে পড়েন। পরে দুজনই নিখোঁজ হলে স্থানীয়রা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাঁদের পানি থেকে তুলে আনেন। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন।
রোববার দুপুরে উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের কার্তিকাহার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি খালে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বেদবাড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে নূর ইসলাম (২২) এবং তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (১৮)। সুমাইয়া একই উপজেলার কার্তিকাহার গ্রামের শাহিন ইসলামের মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। অল্প সময়ের দাম্পত্য জীবনের এমন আকস্মিক পরিণতিতে দুই পরিবারেই নেমে এসেছে গভীর শোক।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নূর ইসলাম শনিবার বিকেলে স্ত্রী সুমাইয়াকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়ি কার্তিকাহার গ্রামে বেড়াতে যান। পরদিন রোববার দুপুরে আনুমানিক বেলা একটার দিকে তিনি গ্রামের পাশের খালে গোসল করতে নামেন। এ সময় সুমাইয়া খালের পাড়ে অবস্থান করছিলেন।
গোসলের একপর্যায়ে হঠাৎ নূর ইসলাম পানিতে তলিয়ে যান। স্বামীকে পানিতে ডুবে যেতে দেখে সুমাইয়া চিৎকার করে তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে স্বামীকে বাঁচানোর আশায় তিনিও খালের পানিতে নেমে পড়েন। কিন্তু স্রোত ও পানির গভীরতার কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমাইয়াও পানিতে নিখোঁজ হয়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ বদলে যায় আতঙ্কে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন দ্রুত খালের কাছে ছুটে আসেন। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টার পর খালের পানির ভেতর থেকে নূর ইসলাম ও সুমাইয়াকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরে দ্রুত তাঁদের বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।
বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কাজী তাহরিমা আক্তার জানান, স্থানীয় লোকজন দুজনকে নিথর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত দম্পতির স্বজনেরা জানান, মাত্র ছয় মাস আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য সুমাইয়ার শেষ মুহূর্তের চেষ্টা ঘটনাটিকে আরও বেদনাবিধুর করে তুলেছে। একই ঘটনায় পরিবারের দুই তরুণ সদস্যকে হারিয়ে স্বজনেরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। স্থানীয়দের মধ্যেও এ ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের আবহ।
বদলগাছী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, পানিতে ডুবে ওই দম্পতির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, খালটির পানির গভীরতা সম্পর্কে অনেক সময় বাইরে থেকে সঠিক ধারণা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে স্রোত ও তলদেশের প্রকৃতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাঁতার জানা থাকলেও অপরিচিত বা গভীর জলাশয়ে সতর্কতা ছাড়া নামা বিপজ্জনক। পানিতে কেউ তলিয়ে গেলে প্রশিক্ষণ ছাড়া সরাসরি ঝাঁপ দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত স্থানীয় উদ্ধারকারী দল বা জরুরি সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
নূর ইসলাম ও সুমাইয়ার এই মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, জলাশয়ে গোসল বা সাঁতার কাটার সময় অসতর্কতার সামান্য সুযোগও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে অপরিচিত খাল, নদী বা গভীর জলাশয়ে নামার আগে পানির গভীরতা, স্রোত ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। মাত্র ছয় মাসের দাম্পত্য জীবনের এমন আকস্মিক সমাপ্তিতে কার্তিকাহার ও নিহতদের নিজ নিজ এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ভারী ছায়া।