খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
জাপানের জীবন বীমা খাত তিনটি দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দেশটির সংকুচিত ও বার্ধক্যগ্রস্ত জনসংখ্যার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাপানি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি পুনর্বীমার (Reinsurance) ওপর নির্ভরতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করছে। তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এই কৌশলগুলো কি তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের মন্দা ও মূলধনের নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোজনিত ঝুঁকি পুরোপুরি সামাল দিতে পারবে?
আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ক্রেডিটসাইটস (CreditSights) এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে যে, অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হলেও জাপানের জীবন বীমা খাত পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখতে সক্ষম এবং তারা ক্রমবর্ধমানভাবে বৈশ্বিক বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তবে এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের নতুন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
জাপানের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এজেন্সির (FSA) প্রবর্তিত নতুন অর্থনৈতিক মানদণ্ড ‘জাপান ইন্স্যুরেন্স ক্যাপিটাল স্ট্যান্ডার্ড’ (J-ICS) মার্চ ২০২৬ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। এই কাঠামোটি মূলত সুদের হারের পরিবর্তন, গ্রাহকদের বীমা বাতিলের প্রবণতা, সম্পদ ও দায়ের মধ্যকার অসমতা (ALM mismatch) এবং দীর্ঘমেয়াদি বীমা দাবির ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনের সুরক্ষায় বীমা ঝুঁকি পুনর্বীমা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বৈশ্বিক রেটিং সংস্থা এ.এম. বেস্টের (A.M. Best) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নতুন এই কাঠামোর ফলে পুনর্বীমার ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে পুনর্বীমার যে মূল পরিসংখ্যান পাওয়া যায়:
প্রিমিয়াম পুনর্বীমার হার: ২০২০ সালে অর্জিত মোট প্রিমিয়ামের ১০ শতাংশের কম পুনর্বীমা করা হলেও ২০২৩ ও ২০২৪ সাল নাগাদ তা বেড়ে ২৪ শতাংশ অতিক্রম করেছে।
মূলধনী অনুপাত: শিল্প খাতের মোট মূলধন ও উদ্বৃত্তের (Capital and Surplus) সাপেক্ষে হস্তান্তরিত পুনর্বীমার হার ২০২০ সালে ছিল ৪.৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সাল শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪.৮ শতাংশে।
নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের চিত্র: ডাই-ইচি ফ্রন্টিয়ার লাইফ, প্রুডেন্সিয়াল জিব্রাল্টার ফিন্যান্সিয়াল এবং মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২৪ সালে এই অনুপাত ৫০০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই উচ্চ হারের পুনর্বীমার বিপরীতে একটি সুবিধাজনক দিকও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে জাপানের ব্যক্তিক জীবন বীমা ও অ্যানুইটি পলিসির মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ পুনর্বীমা চুক্তির আওতায় এসেছে, যা সার্বিক বাজারকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছে।
বীমা ঝুঁকি হস্তান্তর মূলধনের বাধ্যবাধকতা কিছুটা কমালেও এতে নতুন এক ধরণের ‘কাউন্টারপার্টি রিস্ক’ বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পুনর্বীমা প্রদানকারী কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারে, তবে পুরো দায়ের বোঝা আবার মূল বীমা প্রতিষ্ঠানের ঘাড়েই এসে চাপবে। এ আশঙ্কা থেকে জাপানের এফএসএ অফশোর পুনর্বীমা, প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোর ভূমিকা, ক্রস-বর্ডার জামানত রক্ষা এবং পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর কঠোর নজরদারির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
নতুন J-ICS ব্যবস্থার অধীনে আগের প্রচলিত কাঠামোর তুলনায় সলভেন্সি রেশিও বা দায় পরিশোধের সক্ষমতার হার কিছুটা কম দেখালেও এটি ব্যবসার মূল ভিত্তি দুর্বল হওয়ার সংকেত নয়। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সংবেদনশীলতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার কারণেই এই পরিবর্তন। দেশটির প্রায় সব বড় বীমা কোম্পানিই এখনও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশ সলভেন্সি রেশিও সুসংহতভাবে বজায় রাখছে।
সম্প্রতি সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ড পোর্টফোলিওতে সাময়িক অনাদায়ি ক্ষতি দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্পদ পুনর্বিনিয়োগে ভালো রিটার্ন এনে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, জাপানি জীবন বীমা খাত বৈশ্বিক বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে তাদের নতুন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সাথে নিজেদের টিকিয়ে রাখে।