খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই জুলাই ২০২৬, ১:৬ পিএম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে যৌন হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যৌন হয়রানির অভিযোগ পুনস্তদন্তে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় নীতিগত আলোচনার পর প্রশাসনিক পর্যায়ে এই কঠোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা শেষে সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এস. এম. মাহবুবুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র’ থেকে প্রাপ্ত তদন্ত প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার পরই অভিযুক্ত শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার আদেশ জারি হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আরও স্পষ্ট করেন যে, বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির যে অভিযোগ রয়েছে, তা অধিকতর যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি নতুন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই প্রশাসনিক কমিটি যৌন হয়রানি নিরোধ কেন্দ্রের মূল প্রতিবেদন পুনর্বিবেচনা করবে এবং আগামী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট সিন্ডিকেটে জমা দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর একাধিক যৌন হয়রানি এবং বিজয়-২৪ হলের ক্যান্টিনকর্মীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের অগোচরে ভিডিও ধারণের মারাত্মক অভিযোগ উঠলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দ্রুত বিচার ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক ক্লাস, পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ডাক দেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশাসন কর্তৃক আশানুরূপ কার্যকর পদক্ষেপ না দেখে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন জোরদার করেন, যার ফলে ক্যাম্পাসে চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই অব্যাহত চাপের মুখেই অবশেষে সিন্ডিকেট সভা থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘোষণা আসে।
| তারিখ / সময় | বিষয় / বিভাগ | ঘটনার বিবরণ ও নেওয়া ব্যবস্থা |
| ১৬ জুন (দুপুর) | এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন | শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগী ছাত্রীর পক্ষে উত্ত্যক্তকরণ ও আপত্তিকর বার্তার প্রমাণপত্রসহ লিখিত অভিযোগ জমা দেন। |
| ১৭ জুন (বিকাল) | যৌন হয়রানি নিরোধ কেন্দ্র | অধ্যাপক মোছা. তাসলিমা খাতুনের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে। |
| জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ | সাধারণ শিক্ষার্থী আন্দোলন | দুই শিক্ষক ও ক্যান্টিনকর্মীর বিচারে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। |
| ৩০ জুলাই | ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভা | অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। |
| ৩০ জুলাই | উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি | বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে ৩-সদস্যের নয়, নতুন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। |
| ৩০ কর্মদিবস | তদন্তের সময়সীমা | ড. রুবেল আনসারের বিষয়ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত সময়। |
| অনির্দিষ্টকাল | শিক্ষার্থী আলটিমেটাম | সকল অভিযুক্তদের চূড়ান্ত শাস্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের ঘোষণা ছিল। |
| বিজয়-২৪ হল | ক্যান্টিনকর্মী বিতর্ক | ছাত্রীদের গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণের অভিযোগ তদন্তে আলাদা আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। |
| প্রাথমিক যোগাযোগ | সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম | ফেসবুক ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট গ্রহণের পর পরই হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে অনৈতিক বার্তা পাঠানো শুরু হয়। |
| অতীত ইতিহাস | এক যুগ আগের ঘটনা | বিবাহিত ও সাধারণ ছাত্রীদের ক্লাসে ও গভীর রাতে কল-বার্তায় মানসিক ও মৌখিক হেনস্থার অতীত অভিযোগ প্রকাশ। |
ভুক্তভোগী ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অভিযোগের সাথে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান অ্যাপ (যেমন- হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার)-এ অভিযুক্ত শিক্ষকের পাঠানো অসংলগ্ন ও অনৈতিক বার্তার স্ক্রিনশট ও নথিপত্র যুক্ত করেন।
অভিযোগপত্রে সংযুক্ত আপত্তিকর বার্তার উল্লেখযোগ্য অংশ:
“তোমার মতো মেয়ে বিয়ের আগে পাওয়া দরকার ছিল।”
“আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে… লাভ ইন ইংলিশ দ্য জান্নাহ।”
“আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, তাহলে আজ থেকে ভালোবাসা শুরু হোক।”
“বন্ধুর সঙ্গে হাগ করলে সব ডিপ্রেশন থাকে না।”
“তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে দুনিয়ায় কম আছে।”
“ডিসিপ্লিনে আমি শুধু মারি, আদর করে মারি… কোনো মেয়েদের মারি না, কিন্তু তোমাকে মারতে হবে।”
ঘটনার বিষয়ে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রী জানান যে, ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠানোর পরপরই তা শিক্ষক কর্তৃক গৃহীত হওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে কুশল বিনিময়ের আড়ালে অনভিপ্রেত বার্তা আসা শুরু হয়েছিল।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর বক্তব্য:
“শুরুতে তিনি ভালো আচরণ দেখালেও ধীরে ধীরে তার পাঠানো বার্তাগুলো অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও মানসিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে অসহ্য হয়ে সহপাঠী ও ডিসিপ্লিন প্রতিনিধিদের জানাই। শুরুতে কিছুটা ভয় পেলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি মনে করেই সামনে এসেছি। আমি চাই অন্য ভুক্তভোগীরাও সাহস করে কথা বলুক। এই দৃষ্টান্তমূলক বিচার যেন ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এমন মানসিক নিপীড়নের মুখোমুখি হতে না দেয়।”
এছাড়া, একই ডিসিপ্লিনের এক প্রাক্তন ও বর্তমান কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মৌখিক ও মানসিক হেনস্থার ইতিহাস প্রায় এক যুগের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাপকভাবে চালুর পূর্বেও তিনি ক্লাসে কিংবা গভীর রাতে ফোনে বিবাহিত ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর প্রশ্ন করে অস্বস্তিতে ফেলতেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই কঠোর ও প্রশাসনিক পদক্ষেপকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বাগত জানিয়েছে এবং বাংলা ডিসিপ্লিনের অভিযুক্ত অপর শিক্ষক ও হলের অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধেও দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মন্তব্য