খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ১:১৭ পিএম
৩৪ বছর ধরে তাঁর পরিচয় ছিল—‘দেশদ্রোহীর স্ত্রী’। রাষ্ট্রের প্রচারিত সেই অপবাদ বুকে নিয়ে তাঁকে পার করতে হয়েছে জীবনের দীর্ঘ ৩৪টি বছর। অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁর স্বামী কর্নেল আবু তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অথচ ইতিহাসের নির্মমতম সত্য হলো—অপবাদ যত দীর্ঘই হোক, সত্য একদিন নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের জন্য অবিচল সংগ্রাম করেছেন লুৎফা তাহের। প্রতিকূলতা, অপমান, সামাজিক চাপ ও সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণা—সবকিছুকে অদম্য সাহস ও অসীম ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই সংগ্রাম বৃথা যায়নি।
২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্নেল আবু তাহেরের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দেন। সেই রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, কর্নেল তাহেরের বিচার ছিল আইনের পরিপন্থী; বিচারের নামে তাঁকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। এই রায় শুধু একজন মানুষের সম্মানই ফিরিয়ে দেয়নি, তাঁর পরিবারকেও বহু বছরের অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়েছে। এরপর লুৎফা তাহের গর্বের সঙ্গে তাঁর সন্তানদের বলতে পেরেছেন—”তোমাদের বাবা একজন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা; ইতিহাস তাঁর যথার্থ মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে।”
লুৎফা তাহের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সংগ্রামী নারী, কষ্টসহিষ্ণু ও ধৈর্যশীলা ব্যক্তিত্ব। তিনি শহীদ জায়া হিসেবে যেমন সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০১৪ সালে তিনি জাসদ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলার জন্য সংরক্ষিত নারী আসন-৪০ থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
তাঁর স্বামী কর্নেল আবু তাহের (বীর উত্তম) ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার, একজন কিংবদন্তিতুল্য মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক সামরিক কর্মকর্তা। স্বাধীনতার জন্য তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত হন।
এই দম্পতির তিন সন্তান—জয়া তাহের, আবু কায়সার যীশু এবং মিশু।
১৯৪৭ সালের ৩১ জুলাই কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন লুৎফা তাহের। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—সত্য, ন্যায় এবং আদর্শের পথে অবিচল থাকাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অন্যায় কখনো চিরস্থায়ী হয় না। সত্যকে হয়তো কিছু সময়ের জন্য আড়াল করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। অন্ধকার ভেদ করে যেমন সূর্যের আলো একদিন পৃথিবীকে আলোকিত করে, তেমনি সত্যও একদিন তার আপন দীপ্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শুভ জন্মদিন, গর্বিতা শহীদ জায়া লুৎফা তাহের।
আপনার ত্যাগ, ধৈর্য, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার লড়াই বাংলাদেশের ইতিহাসে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, শান্তিময় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত শুভকামনা।
মন্তব্য