খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:২ পিএম
দিন দিন মানুষের মাঝ থেকে ‘বিশ্বাস’ হারিয়ে যাচ্ছে—এমন কথাই প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের কর্ম, সততা ও শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেন—’বিশ্বাস’ কখনো হারিয়ে যায় না; বরং মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।
আজ তেমনই এক ‘বিশ্বাস’-এর কথা বলছি। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চের প্রিয় মুখ—অরুণা বিশ্বাস।
বাংলা নাট্যাঙ্গনের কিংবদন্তি নটরাজ অমলেন্দু বিশ্বাস ও প্রখ্যাত শিল্পী জ্যোৎস্না বিশ্বাস-এর কন্যা অরুণা বিশ্বাস জন্ম থেকেই বেড়ে উঠেছেন শিল্প-সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ পরিবেশে। পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে তিনি শুধু ধারণই করেননি, নিজের প্রতিভা, শ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৬৭ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন অরুণা বিশ্বাস। পড়াশোনা করেছেন টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী ভারতেশ্বরী হোমস-এ, সেখান থেকেই ১৯৮৩ সালে এসএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কানাডার Oxford College থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজির ওপর ডিপ্লোমা লাভ করেন।
অভিনয়ের হাতেখড়ি চলচ্চিত্রে নয়, মঞ্চে। তিনি ছিলেন বহুবচন নাট্যদলের সদস্য। কামাল উদ্দিন নীলুর নির্দেশনায় ‘তিন পয়সার পালা’ নাটকের মাধ্যমে ঢাকার মঞ্চে তাঁর অভিনয়যাত্রা শুরু হয়।
১৯৮৪ সালে নরেশ ভুঁইয়ার পরিচালনায় ‘এখানে জীবন’ নাটকে আফজাল হোসেনের বিপরীতে অভিনয় করে ছোট পর্দার দর্শকদের নজর কাড়েন। এরপর ১৯৮৬ সালে কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ‘চাঁপাডাঙার বউ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। সেই ছবির অভিনয় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আলোচনায় স্থান করে নেয়।
পরবর্তী চার দশকেরও বেশি সময়ে তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বাপ্পারাজ, ইলিয়াস কাঞ্চন, ওমর সানী, আলীরাজ, মান্নাসহ জনপ্রিয় অনেক নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে দর্শকদের উপহার দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য ও সংগীতেও তাঁর দক্ষতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।
শুধু অভিনয়েই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি অরুণা বিশ্বাস। নাটক ও চলচ্চিত্র প্রযোজনা, নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নির্মিত তাঁর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঠিকানা বত্রিশ’ প্রশংসিত হয়েছে সচেতন মহলে। সরকারি অনুদানে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্র ‘অসম্ভব’ একজন নির্মাতা হিসেবেও তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর বহন করে।
তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্প-সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে ‘শিল্পকলা পদক’ লাভ করেন।
১৯৮৪ থেকে ২০২৬—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে নিরলস অভিনয়সাধনার মাধ্যমে তিনি যেমন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তেমনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন স্নেহময়ী মা। তাঁর একমাত্র পুত্র শুদ্ধ বর্তমানে কানাডায় কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত।
আজ তাঁর জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা—তিনি আপনাকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, মানসিক প্রশান্তি এবং আরও বহু বছর শিল্পসাধনার শক্তি দান করুন। আপনার অভিনয়, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় অরুণা বিশ্বাস।
আপনার শিল্পযাত্রা হোক আরও দীর্ঘ, আরও দীপ্তিময়। বাংলা সংস্কৃতির আকাশে আপনি এভাবেই উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলতে থাকুন—এই আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা।
মন্তব্য