খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:১২ পিএম
“ইয়ে দুনিয়া, ইয়ে মেহফিল মেরে কাম কি নাহি…”
অথবা “চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে সাঁঝ সাভেরে…”—যে কণ্ঠ একসময় সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে মুগ্ধ করেছিল, সেই কণ্ঠ আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তিনি আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অমর। তিনি কিংবদন্তি শিল্পী মোহাম্মদ রফি।
১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কোটলা সুলতান সিং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা হাজী আলী মোহাম্মদের ছয় সন্তানের মধ্যে ছিলেন রফি; তাঁর ডাকনাম ছিল ‘ফিকো’। ছোটবেলায় গ্রামের এক ফকিরের ভজন অনুকরণ করতে করতেই তাঁর সঙ্গীতজীবনের সূচনা।
সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে নিয়ে যায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর সাধনায়। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান, ওস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবনলাল মত্তো এবং ফিরোজ নিজামীর মতো প্রখ্যাত গুরুর কাছে তালিম গ্রহণ করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে লাহোরে কিংবদন্তি কে. এল. সায়গলের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে গান পরিবেশন করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১৯৪১ সালে শ্যাম সুন্দরের সুরে লাহোরে চলচ্চিত্রের গায়ক হিসেবে তাঁর অভিষেক ঘটে। পরে বোম্বেতে এসে হিন্দি চলচ্চিত্রে নিয়মিত প্লেব্যাক শুরু করেন। ১৯৪৯ সাল থেকে নওশাদ, শ্যাম সুন্দর, হুসনলাল-ভগতরামসহ খ্যাতিমান সুরকারদের সান্নিধ্যে তাঁর অসাধারণ উত্থান শুরু হয়।
পরবর্তী চার দশক তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন। নওশাদ, ও. পি. নায়ার, শঙ্কর-জয়কিষাণ, শচীন দেব বর্মণ, মদন মোহন, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারে লালসহ প্রায় সব কিংবদন্তি সুরকারেরই প্রিয় কণ্ঠ ছিলেন তিনি।
শুধু নওশাদের সুরেই তিনি ১৪৯টি গান গেয়েছেন, যার মধ্যে ৮১টি ছিল একক। শঙ্কর-জয়কিষাণের সুরে তাঁর গাওয়া গানের সংখ্যা ৩৪১টি, যার ২১৬টিই একক। শচীন দেব বর্মণের সুরে পিয়াসা, কাগজ কে ফুল, তেরে ঘর কে সামনে, গাইড, আরাধনা ও অভিমানসহ অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ অমর হয়ে আছে।
ও. পি. নায়ার একবার বলেছিলেন—
“যেখানে মোহাম্মদ রফি নেই, সেখানে ও. পি. নায়ারও নেই।”
এই একটি বাক্যই রফির শিল্পীসত্তার মহিমা তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।
১৯৪৫ থেকে ১৯৮০—এই দীর্ঘ সময়ে তিনি হাজার হাজার গান গেয়েছেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, গজল, কাওয়ালী, ভজন, দেশাত্মবোধক গান, প্রেম, বিরহ কিংবা হাস্যরস—প্রতিটি ধারাতেই তিনি ছিলেন অনন্য। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবি, মারাঠি, গুজরাটি, তেলেগু, কন্নড়, ওড়িয়া, ভোজপুরি, অসমিয়া, সিন্ধি, ফার্সি, ইংরেজি, ডাচ, স্প্যানিশসহ বহু ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে বিশ্বসংগীতের এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই, মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের প্রস্থান ছিল; তাঁর কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। প্রতিটি প্রজন্ম নতুন করে আবিষ্কার করে তাঁর গান, তাঁর আবেগ, তাঁর অসাধারণ শিল্পীসত্তা।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আপনি নেই, কিন্তু আপনার কণ্ঠ আছে।
আপনি নেই, কিন্তু আপনার গান আছে।
আর যতদিন সুরের পৃথিবী থাকবে, ততদিন মোহাম্মদ রফি অমর হয়ে থাকবেন সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, কিংবদন্তি মোহাম্মদ রফি।
মন্তব্য