খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ২:১ পিএম
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় সংঘটিত এক বিভৎস হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটেছে নিখোঁজের ১০ দিন পর। কমলাপুর কাস্টম হাউসে কর্মরত সিপাহী আবু রায়হান তালুকদার (৪০)-এর ১৫ টুকরো করা গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। অত্যন্ত নির্মম ও পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রোববার সকালে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর উত্তরপাড়া গ্রামে নিহতের নিজ বাড়ির পাশের একটি পুকুরে তিনটি সন্দেহজনক ব্যাগ এবং একটি কাপড়ের পোটলা ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠলে স্থানীয়দের সন্দেহ ঘনীভূত হয় এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে থানায় খবর দেন।
সংবাদ পেয়ে ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুকুর থেকে ভেসে থাকা তিনটি ব্যাগ ও কাপড়ের পোটলাটি তীরে তুলে এনে খোলার পর দেখা যায়, তার ভেতরে মানুষের খণ্ডিত দেহাবশেষ রয়েছে। দেহের বিভিন্ন অংশ মেপে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, নৃশংসভাবে মরদেহটিকে মোট ১৫টি টুকরো করা হয়েছে। কয়েক দিন পানির নিচে ডুবে থাকার ফলে মৃতদেহটিতে পচন ধরেছিল এবং তা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত আবু রায়হান তালুকদার কমলাপুর কাস্টম হাউসে সিপাহী পদে নিষ্ঠার সাথে চাকরি করছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী বিচ্ছেদের পর তিনি একা জীবনযাপন করতেন। চাকরি সূত্রে বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করলেও বৃদ্ধা মায়ের দেখভালের জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহেই গ্রামের বাড়িতে আসতেন। বাড়িতে নিরাপত্তার স্বার্থে ও দেখভালের জন্য রাজু নামের এক কিশোরকে কেয়ারটেকার হিসেবে রেখেছিলেন। রায়হান অত্যন্ত সহৃদয়তার সাথে ওই কিশোরের লেখাপড়ার সমস্ত খরচ এবং মাসিক ভাতাও বহন করতেন।
গত ২৩ জুলাই রাতে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসেন আবু রায়হান। পরদিন ২৪ জুলাই, শুক্রবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। নিহতের স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, কেয়ারটেকার রাজু এবং তার বন্ধু জিতুল রায়হানকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে দেওয়ার কথা বলে বের হন। এরপর থেকেই আবু রায়হান সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
ঘটনার সময়ক্রম:
২৩ জুলাই: ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আগমন।
২৪ জুলাই: কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ।
২৬ জুলাই: কর্মস্থল থেকে স্বজনদের কাছে রায়হানের অনুপস্থিতির খবর প্রদান।
২৭ জুলাই: ফুলবাড়িয়া থানায় নিহতের বড় ভাই নূরুল ইসলাম কর্তৃক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের।
৩১ জুলাই (শুক্রবার): বাজুয়া নদী থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল কর্তৃক আবু রায়হানের চাবির রিং উদ্ধার।
২ আগস্ট (রোববার): নিজ বাড়ির পাশের পুকুর থেকে ১৫ টুকরো করা মরদেহ উদ্ধার।
রায়হান নিখোঁজ হওয়ার দু’দিন পর কর্মস্থল থেকে সহকর্মীরা তার পরিবারকে জানান যে, তিনি অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার ব্যবহৃত একমাত্র মোবাইল ফোনটিও শুরু থেকেই বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়স্বজনরা সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ২৭ জুলাই নিহতের বড় ভাই মোঃ নূরুল ইসলাম ফুলবাড়িয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন।
জিডি দায়েরের পর থেকেই নিখোঁজের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার উপজেলার অনন্তপুর এলাকার বাজুয়া নদীতে অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। সেখান থেকে আবু রায়হানের ব্যবহৃত চাবির রিংটি উদ্ধার করা হয়, যা হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক আলামত হিসেবে চিহ্নিত হয়।
নিহতের পরিবারের জোরালো অভিযোগ, আবু রায়হান নিখোঁজ হওয়ার দিন থেকেই কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুল এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। যাকে আশ্রয় ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, সেই রাজু ও তার সঙ্গীদের আচরণ অত্যন্ত সন্দেহজনক। স্বজনদের ধারণা, আর্থিক কোনো লোভ কিংবা সুনির্দিষ্ট শত্রুতার জের ধরে রাজু ও জিতুলই এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান জানান, অত্যন্ত নৃশংসভাবে আবু রায়হানকে হত্যা করা হয়েছে। অপরাধীরা তাদের পরিচয় ও অপরাধ ঢাকতে মরদেহটি ১৫ টুকরো করে ভারী ব্যাগে ভরে পুকুরে ডুবিয়ে রেখেছিল। কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পচে গ্যাসে ফুলে উঠে ব্যাগগুলো পুকুরের পানিতে ভেসে ওঠে।
উদ্ধারকৃত খণ্ডিত মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং আত্মগোপনে থাকা সন্দেহভাজন কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুলসহ সম্ভাব্য জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
মন্তব্য