খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৫ পিএম
ইরান ও ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালির কৌশলগত ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত আলোচনা এক নতুন ও সংবেদনশীল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের মধ্যেই একটি আন্তর্জাতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, আলোচনার টেবিল খানিকটা এগোলেও চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনও চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা। মূল দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি প্রধান প্রশ্ন—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি নৌপথের ওপর কতটা কর্তৃত্ব ধরে রাখবে তেহরান, আর সেই সার্বভৌম শর্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো শেষ পর্যন্ত মেনে নেবে কি না।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, “একটি সমঝোতা হয়ে যেতে পারে। হয়তো আগামীকাল কিংবা তার পরের দিনই এটি বাস্তবে রূপ নেবে। দুই পক্ষের আলোচনার টেবিলে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তারা নিজেরাই আমাকে ফোন করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।” তবে কূটনৈতিক নমনীয়তার পাশাপাশি সামরিক হুংকার দিতেও ছাড়েননি তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, শেষ পর্যন্ত চুক্তি না হলে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করবে না।
কে কার সঙ্গে আলোচনা করছে?
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এই আলোচনার প্রকৃতি ও বিন্যাস নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে গোড়া থেকেই দাবি করা হচ্ছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি কোনো টেবিলে বসছে না। তেহরানের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য মতে, কেবল ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি সাময়িক ও কার্যকরী ব্যবস্থা দাঁড় করাতেই তারা কথা বলছে।
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ সমঝোতা অর্জনের সম্ভাবনা মূলত ৫০-৫০। তার মতে আলোচনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও জটিলতা হলো, ইরানের মধ্যস্থতাকারী প্রতিনিধি দলে দেশটির মূল সামরিক চালিকাশক্তি ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসির (IRGC) কোনো সরাসরি প্রতিনিধি নেই। অথচ হরমুজের নৌপথে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে এই প্রভাবশালী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সম্মতি ও সমর্থন একেবারেই অপরিহার্য।
চুক্তির বিলম্ব নিয়ে তেহরানের মার্কিনবিরোধী অবস্থান
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ ও ‘ফার্স নিউজ’ আন্তর্জাতিক সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় চলমান বৈঠক বিলম্বিত হওয়ার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনঘন সামরিক হুমকি। ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওয়াশিংটনের কিছু উর্ধতন কর্মকর্তা ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা আলোচনা প্রবাহে পরস্পরবিরোধী বার্তা পাঠাচ্ছে, যা অগ্রগতির পথকে জটিল করে তুলছে।
ফার্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ইরান কেবল মাসকাটের (ওমান) সঙ্গেই কূটনৈতিক স্তরে কথা বলছে। তাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও মধ্যবর্তী নৌপথ নিশ্চিত করা, যা একদিকে আন্তর্জাতিক ওমানি উদ্বেগ প্রশমিত করবে এবং অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী চাওয়া
ইরানের সরকারি আলোচক কমিটির সদস্য সাঈদ আজোরলু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি-কে জানান, প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা, সামুদ্রিক মাইন অপসারণ এবং সাধারণ নৌসেবা পরিচালনায় ইরানের মূল কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হবে। তেহরানের পরিকল্পনা হলো অন্তত এক থেকে তিন মাসের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে প্রণালিতে ইরানের আধিপত্য সুনির্দিষ্ট থাকবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বর্তমানে আলোচনার রূপরেখা নিয়ে জানান, ওমানের সমুদ্রসীমা ঘেষা দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট এবং ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় রুটকে সমন্বিত করে একটি যৌথ সেফ-করিডর তৈরির কাজ চলছে। তবে ইরানি নীতিনির্ধারকেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, যেখানে কোনো একক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের মতোই হরমুজে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখাকে এখন অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে তারা।
অপরদিকে মার্কিন প্রশাসন কৌশলগত এই অবস্থান মানতে পুরোপুরি নারাজ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ধারার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর কোনো একক দেশের সার্বভৌম বা একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য বিপদ ডেকে আনবে। যদি কোনো দেশ জোরপূর্বক টোল আদায় কিংবা জাহাজে হামলার ভয় দেখিয়ে জলপথ অবরুদ্ধ করার নজির তৈরি করে, তবে তা বিশ্বের অন্যান্য আন্তর্জাতিক রুটেও মারাত্মক বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। এই যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের আঞ্চলিক মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের একক আধিপত্যের প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
অমীমাংসিত প্রশ্ন ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, স্থায়ী সমঝোতার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নের উত্তর মেলা প্রয়োজন। যেমন—
আইআরজিসি প্রণালিতে তাদের নিরঙ্কুশ সামরিক টহল সীমিত করতে রাজি হবে কি না?
মার্কিন বা অন্যান্য পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে কি না?
পণ্যের ধরন বা গন্তব্য সংক্রান্ত গোপন তথ্য ইরানের কাছে প্রকাশে জাহাজগুলো বাধ্য থাকবে কি না?
জবাবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং তেল রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি শিথিল হবে কি না?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি মনে করেন, ইরানের মূল লক্ষ্য কেবল টোল আদায় নয়, বরং যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত কৌশলগত সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী উন্মুক্ত অবস্থায় হরমুজকে ফিরিয়ে নিতে হলে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হতো, যা ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই টানাপোড়েনের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ‘সৌদি আরামকো’র প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, আজই যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়, তবুও বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ও মজুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে। উল্লেখ্য, এই রুট দিয়ে প্রতিদিন বিশ্ববাজারের চাহিদার প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে সমঝোতা বিলম্বিত হওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মন্তব্য