খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৫ এএম
ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) এক ১৪ বছর বয়সী নিবাসী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও উদাসীনতার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। গঠিত চার সদস্যের তদন্ত দল তাদের নিবিড় অনুসন্ধানে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও স্পর্শকাতর ঘটনার পেছনে প্রধানত তিনটি মৌলিক কারণ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
গত ৫ জুলাই ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার তথ্যটি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসে। চরম নিরাপত্তা ও নজরদারির মধ্যে থাকার কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এমন ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরের দিন, ৬ জুলাই শিশু পরিবারের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি ধর্ষণের মামলা করেন। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় ৭ জুলাই ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম চার সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুস্মিতা সাহাকে এই কমিটির আহ্বায়ক এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সুলতানাকে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন এবং সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডায়াবেটিক রেজিস্টার্ড সেবিকা (ডিআরএস) ও মেডিকেল কর্মকর্তা ড. নূপুর পাল। গত ১৩ জুলাই থেকে কমিটি তাদের আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে গত ২৯ জুলাই তদন্ত কমিটি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়, যার বিস্তারিত তথ্য প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়। প্রতিবেদনে ঘটনার পেছনে তিনটি মূল কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও উদাসীনতা: তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে যে ধরনের সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত ছিল, তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন সেখানে পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে কেবল ‘চাকরি করার মানসিকতা’ কাজ করেছে, দায়িত্ব পালনের প্রতি ছিল সীমাহীন উদাসীনতা। একটি ১৪ বছরের কিশোরী দীর্ঘ ছয় মাস ধরে অন্তঃসত্ত্বা, অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা স্বাস্থ্যকর্মীরা তা টের পাননি—এটি তাদের পেশাগত গাফিলতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এছাড়া নিবাসী শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা কিংবা অগোচরে বাইরে বের হয়ে গভীর রাতে ফেরার মতো শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে বারবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা সতর্ক করলেও তত্ত্বাবধায়ক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি।
ভুক্তভোগীর অসহায় পারিবারিক বাস্তবতা: কিশোরীটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর সৎ মায়ের সংসারে লালিত-পালিত হওয়ার কারণে তার শৈশব কেটেছে চরম অবহেলা, ভালোবাসা ও মানসিক নিরাপত্তার অভাবে। দীর্ঘদিনের মানসিক একাগ্রতার ঘাটতি ও সহানুভূতির তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে যেকোনো প্রান্ত থেকে আসা সাময়িক আশ্বাসের প্রতি অতি-নির্ভরশীল করে তোলে। সঠিক-ভুলের তোয়াক্কা না করে সামান্যতম সহানুভূতিকে আঁকড়ে ধরার এই মানসিক বলয়ই তাকে অজান্তে এই ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অভিযুক্তের ধর্ষকামী ও বিকৃত মানসিকতা: ঘটনার পেছনে তৃতীয় প্রধান কারণ হিসেবে স্থানীয় এক দর্জি ব্যবসায়ীর বিকৃত রুচি ও ধর্ষকামী মানসিকতাকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি, যে ওই কিশোরীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এই জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করেছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা জানান, অনাবাসিক ও নিবাসী কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিশু পরিবারের প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, এই জাতীয় বালিকা নিবাসের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে নারী কর্মকর্তা পদায়ন করা হলে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর হবে বলে তারা মনে করেন।
তদন্ত দল কর্তৃক পেশকৃত প্রধান প্রধান সুপারিশগুলো হলো: ১. দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ২. শিশু পরিবারের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে একজন দায়িত্বশীল নারী কর্মকর্তাকে পদায়ন করা। ৩. নিবাসীদের শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতি মাসে অন্তত একবার বাধ্যতামূলক নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনা করা। ৪. প্রতিষ্ঠানে দর্শনার্থী ও বাইরের যেকোনো ব্যক্তির যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী তদারকি বা নজরদারি কমিটি গঠন করা। ৫. ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত দর্জি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
ঘটনার সত্যতা ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর তা নিজস্ব সুপারিশসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজধানী ঢাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দায়িত্বে চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় ইতিমধ্যে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ মোট ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন:
সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন
তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান
কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস
মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার
আয়া শামসুন্নাহার আক্তার
আয়া তানিয়া তাজরীন
বরখাস্তকৃত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য