হাসপাতালে আহত মা–বাবা, জানেন না সন্তানের মৃত্যুর কথা
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৩৯ পিএম
সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। বাসের জানালার পাশে বসে ১৬ বছর বয়সী জান্নাতুল চারপাশের দৃশ্য দেখছিল। পাশে ছিল তার ছোট ভাই মোহাম্মদ। বাসের ডান পাশের আসনে বসেছিলেন বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও মা নুরুন্নাহার। তাঁদের কোলে ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য, তিন বছরের জায়ফা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার সেই পথযাত্রাই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। পরিবারের সবাই আহত হলেও প্রাণ হারায় ছোট্ট জায়ফা। গুরুতর আহত বাবা-মা এখনো জানেন না, যাকে বুকে আগলে তাঁরা ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন, সেই সন্তান আর বেঁচে নেই।
শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশীকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে বাসটিতে থাকা বহু যাত্রী আহত হন। ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ছিল তিন বছরের জায়ফাও।
দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসকেরা জায়ফাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে জান্নাতুল। সে জানায়, ছোট বোন জায়ফা তখন বাবা-মায়ের কোলে ছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায়। কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই বাসটি খাদে পড়ে যায়। এরপর চারদিকে শুধু আর্তনাদ আর আহত মানুষের চিৎকার।
দুর্ঘটনায় জান্নাতুল ও তার ভাই মোহাম্মদ তুলনামূলকভাবে কম আহত হলেও বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও মা নুরুন্নাহার গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। জাহাঙ্গীর আলমের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়েছে এবং তিনি প্রায় অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে নুরুন্নাহারের মুখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত রয়েছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন দুজনই।
পরিবারটির স্বজনেরা জানিয়েছেন, বাবা-মায়ের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁদের এখনো জানানো হয়নি যে তাঁদের ছোট মেয়ে আর বেঁচে নেই। চিকিৎসকেরা আগে তাঁদের শারীরিক অবস্থার উন্নতির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
জাহাঙ্গীর আলম সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় টায়ার মেরামতের ব্যবসা করেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তাঁর প্রতিবেশী ব্যবসায়ী হাসান আহমদ দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। তিনি জানান, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই ফোন করে দুর্ঘটনার কথা জানান। হাসপাতালে এসে তিনি দেখেন পরিবারের প্রায় সবাই আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরে জানতে পারেন, ছোট্ট জায়ফা মারা গেছে।
হাসান আহমদ বলেন, পুরো পরিবারটিই গভীর বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। আহত বাবা-মায়ের পাশে থেকে সন্তানদের দেখাশোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা করার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা।
দুর্ঘটনার বিষয়ে শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কাশীকাপন এলাকায় ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে বেঙ্গল পরিবহনের বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে সাতজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন, যাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের মহাসড়কে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপদ গতিসীমা নিশ্চিত করা, চালকদের সতর্কতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। আর জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারের জন্য এই যাত্রা হয়ে থাকল এক অপূরণীয় শোকের স্মৃতি—যেখানে চিকিৎসাধীন বাবা-মা এখনো জানেন না, তাঁদের কোলের শিশুটি আর কোনো দিন ঘরে ফিরবে না।
মন্তব্য