খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:২১ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো সামাজিক শত্রুতার জেরে দুটি গ্রাম্য দলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার উপজেলার বিটঘর ইউনিয়নের টিয়ারা গ্রামে গ্রামীণ মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দুপক্ষ। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘাতের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় অধিবাসীদের সূত্রে জানা যায়, টিয়ারা গ্রামের সামাজিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকার প্রভাবশালী আতিকুর রহমান ওরফে শিশু মিয়া এবং একই গ্রামের অধিবাসী সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন আহমেদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই শত্রুতা চলে আসছিল। এই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে প্রায়শই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মারামারি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
সংঘাতের পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জানা গেছে একটি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক। গতকাল শুক্রবার বিকেলে উপজেলার ভদ্রগাছা এলাকা থেকে ফুটবল খেলা শেষে বাড়ি ফিরছিলেন আবুল হোসেনের পক্ষের আপন মিয়া (১৮) ও বায়েজিদ আহমেদ (১৬)। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে টিয়ারা গ্রামে তাদের একা পেয়ে আতিকুর রহমানের সমর্থকেরা বেদম মারধর করে। এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে একই দিন বিকেল পাঁচটার দিকে স্থানীয় টিয়ারা বাজারে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারামারি হয়।
পরদিন আজ শনিবার সকালে টিয়ারা বাজারে একই ঘটনার জেরে দুপক্ষের মধ্যে আবারও তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে উভয় পক্ষই গ্রামের মসজিদের মাইক ব্যবহার করে সমর্থকদের সমবেত হওয়ার ডাক দেয়। এতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। দেখতে দেখতে দুই দল সমর্থক রামদা, দেশি টেঁটা, বল্লম, ছেনাকিসহ বিপজ্জনক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ।
দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই তাণ্ডবে কেবল রক্তপাতই ঘটেনি, বরং উভয় পক্ষের বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও বাজারের দোকানপাটে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে নবীনগর থানা-পুলিশের একটি বড় দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংঘর্ষে আহত ৫০ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জনকে আশঙ্কাজনক ও গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। বাকিরা নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আবু কাউসার ও মো. আলামিন জানান, সকালে তর্কের পর মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই দল লোক যেভাবে অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছিল, তাতে পুরো গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, এই দুই পক্ষের বিরোধের ইতিহাস বেশ পুরোনো ও হিংসাত্মক। এর আগে চলতি বছরের ১ ও ২ জুন দুপক্ষের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত হয়েছিল। সেই সময় আবুল হোসেনের সমর্থক ইকবাল মিয়া গুরুতর আহত হন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ জুন তিনি মারা যান। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতিকুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোরশেদ আলম চৌধুরী জানান, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন এবং আতিকুর রহমানের মধ্যকার পুরোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক কোন্দলের কারণেই নতুন করে এই সংঘাত ছড়িয়েছে। বর্তমানে পুলিশ গ্রামে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের আটকে পুলিশের অভিযান চলছে।
মন্তব্য