খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
মাথার ওপর নিশ্চিন্ত একখণ্ড ছাদ নেই, ঘরে নেই ন্যূনতম অন্ন সংস্থান। একদিকে কোলের দুই সন্তানের ক্ষুধার জ্বালা, অন্যদিকে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ আশ্রয়— জীবনযুদ্ধের এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন এক মা। কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি। পাওনা ভাড়া পরিশোধ করেও স্থান মেলেনি সেই জীর্ণ ঘরে। দুই সন্তানকে আঁকড়ে ধরে এখন তাঁর ঠাঁই হয়েছে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের খোলা আকাশের নিচে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে। অসহায় এই নারীর নাম রেহানা খাতুন। পারিবারিক কলহ ও অভাব-অনটনের জেরে স্বামী তাঁকে দুই সন্তানসহ ফেলে রেখে চলে যাওয়ার পর থেকেই চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন তিনি। জীবনসংগ্রামের এই করুণ চিত্র সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে গভীর মর্মবেদনা ও সহানুভূতি তৈরি করেছে।
রেহানার জীবনের এই চরম বিপর্যয় সম্পর্কে স্থানীয় সূত্রে বিস্তারিত জানা যায়। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে সন্তোষপুর এলাকায় একটি ছোট ঝুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাতে মাস শেষে সামান্য ভাড়ার টাকাও জোগাড় করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে ঘরের বকেয়া ৫০০ টাকা মেটাতে না পেরে চরম নিরুপায় হয়ে নিজের মাথার দীর্ঘ সুন্দর চুল কেটে বাজারে বিক্রি করে দেন। সেই বিক্রয়লব্ধ টাকা তুলে দেন বাড়িওয়ালার হাতে। কিন্তু চুল বিক্রির সেই কষ্টার্জিত অর্থেও বেশিদিন ঠিকানা স্থায়ী হয়নি। কয়েক মাসের বকেয়া ও অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেই জুপড়ি ঘরটি ছেড়ে দিতে হয়।
ঘর ছাড়ার পর থেকেই রেহানার ঠাঁই হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। কখনো অন্যের বাড়ির উঠানে রাত কাটাতে হয়েছে, আবার কখনো দুই সন্তানকে বুক দিয়ে জড়িয়ে ধরে খুলনা-মোংলা রেললাইনের ধারে অরক্ষিত অবস্থায় প্রহর গুনতে হয়েছে।
বর্তমানে রামপালের সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেলব্রিজের পাশে সরকারি একখণ্ড জমিতে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করে মাথা গোঁজার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন রেহানা। স্থানীয় কয়েকজন দয়ালু মানুষের দেওয়া বাঁশ দিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে সেই ফ্রেমটি দাঁড়িয়ে আছে। তবে টিন ও চারপাশের বেড়া দেওয়ার মতো সামান্য আর্থিক সামর্থ্যও তাঁর নেই। ফলে বাঁশের সেই অসম্পূর্ণ কঙ্কালটি এখনও বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। রোদ, বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাসের মুখোমুখি হয়ে শিশুদের নিয়ে অরক্ষিত অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় রেহানা কিছুদিন অন্য এক প্রতিবেশীর চালার নিচে ছিল। সেখানে সামান্য ৫০০ টাকা ঘরভাড়া মেটাতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দেয়। একদিন হুট করে তার মাথায় চুল না দেখে কারণ জানতে চাইলে রেহানা কেঁদে ফেলে বলেছিল, ‘ও বু, কাউরে কইও না। ঘরের ভাড়া মেটাতে ৫০০ টাকায় আমার চুলগুলো বেচে দিছি।’ এমন কথা শোনার পর নিজের চোখের জল ধরে রাখা যায় না।”
সন্তোষপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবু তালেব শেখ ও মহিদুল ইসলাম জানান, রেহানার স্ট্রাকচার বা ঘরের কঙ্কালটি তৈরিই আছে। এখন কেবল কয়েকটি টিন ও বেড়ার টিনের ব্যবস্থা হলেই একটি পূর্ণাঙ্গ ঘর হয়ে যায়। তীব্র শীতে ও বর্ষায় মা ও শিশুরা যেভাবে কষ্ট পাচ্ছে, তা মেনে নেওয়া কঠিন। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষদের দ্রুত তাঁর দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা খাতুন বলেন, “আমার ছোট দুইটা বাচ্চার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। একদিকে থাকার ঘর নেই, অন্যদিকে খাবারের কষ্ট। উপায় না পেয়ে নিজের চুল কেটে বিক্রি করেছিলাম। আজ আমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়, শুধু মাথার ওপর একটি টিনের ছাউনি চাই। যেন বৃষ্টি এলে বাচ্চাদের নিয়ে ভিজতে না হয় এবং রাতের বেলা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারি।”
রামপালের সন্তোষপুর গ্রামের অধিবাসীরা একবাক্যে দাবি জানিয়েছেন, অসহায় এই পরিবারটিকে দ্রুত সরকারি আশ্রয়ণ বা আবাসন প্রকল্পের আওতায় এনে একটি খাসজমিতে নিরাপদ ঘর বরাদ্দ দেওয়া হোক। সেই সাথে বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে দুই শিশুর অন্ন ও মাথার ওপর একটি স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত হতে পারে।
মন্তব্য