খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৬ পিএম
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকার (JICA) অর্থায়নে পরিচালিত উপকূলীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদাবাজি, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া ও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় স্থানীয় জামায়াত নেতা ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। একই সাথে তাঁর অন্যতম সহযোগী বিশ্বজিৎ মণ্ডলকেও জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সাতক্ষীরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে তারা দুজন জামিনের আবেদন করেছিলেন। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মো. সাইদুর রহমান আসামি পক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পবিত্র কুমার জানান, উচ্চ আদালত থেকে ইতিপূর্বে আসামিরা ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন। তবে সেই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাঁরা নিয়ম অনুযায়ী নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে পুনরায় জামিনের আবেদন জানান। কিন্তু অভিযুক্তদের জামিন দেওয়া হলে স্থানীয়ভাবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হওয়া এবং নথিপত্র বা সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা থাকায় বিচারক জামিন আবেদন সরাসরি খারিজ করেন।
মামলার নথিপত্র ও এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে শ্যামনগর উপজেলার পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায়। সেখানে পানীয় জল ও টেকসই উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য জাইকার অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আর-রাদ করপোরেশন’ উক্ত নির্মাণকাজের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, প্রজেক্টের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই আসামিরা বেআইনিভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তারা প্রকল্পের কর্মরত প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করে।
হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে শেষপর্যন্ত গত ২৫ মে রাতে আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে শ্যামনগর থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলায় জামায়াত নেতা হাজী নজরুল ইসলামকে প্রধান আসামি করার পাশাপাশি তাঁর ছেলে আব্দুর রহমান, সহযোগী বিশ্বজিৎ মণ্ডল এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আসামিরা এত দিন উচ্চ আদালতের জামিনে থাকলেও সোমবার নিম্ন আদালতে হাজিরা দিতে গেলে বিচারিক আদেশে তাঁদের আটক করে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম আদালতের বাইরে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং তাঁর সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন করতেই এই মিথ্যা মামলা সাজানো হয়েছে। প্রকল্পের কোনো কাজের সাথে তাঁর নেতিবাচক সম্পৃক্ততা ছিল না।
তবে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় সোমবার আদালত চত্বরে। জামিন শুনানির খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন পেশাদার সংবাদকর্মী ও ছবিগ্রাহক যখন নজরুল ইসলামের ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখন তাঁর ছোট ছেলে সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেন। একপর্যায়ে সাইফুল অতর্কিত চড়াও হয়ে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ক্যামেরার ট্রাইপড আছাড় দিয়ে ফেলে দেন বলে লিখিত অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং হেনস্থাকারীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
মন্তব্য