খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম
“মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না—
এ ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই,
ছিল স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখার অঙ্গীকার।”
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকাহিনি পড়লে মনে হয়—একটি মানুষের বুকের ভেতর কতটা সাহস, দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধ থাকলে ইতিহাসের গতিপথে নিজের নাম লিখে দেওয়া যায়!
কর্ণেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রম ছিলেন তেমনই একজন অকুতোভয় সৈনিক।
১৯৪০ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণকারী শাফায়াত জামিল ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন দক্ষ, সাহসী ও পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা।
১৯৭১ সালে তিনি কর্মরত ছিলেন ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে, যার অবস্থান ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয় মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে।
পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণের অজুহাত দেখিয়ে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঠায়। একটি কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন শাফায়াত জামিল।
কিন্তু ইতিহাস তখন অন্য কিছু লিখতে প্রস্তুত।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন বাঙালি সৈনিকদের কাছেও স্পষ্ট হয়ে যায়—এ যুদ্ধ আর কেবল সেনাবাহিনীর ভেতরের কোনো দ্বন্দ্ব নয়; এ যুদ্ধ বাঙালির অস্তিত্বের যুদ্ধ।
২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের খবর পাওয়ার পর শাফায়াত জামিল তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা নন—
তিনি হয়ে গেলেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা।
রণাঙ্গনে শাফায়াত জামিল
প্রতিরোধযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তিনি আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া ও গঙ্গাসাগর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন।
পরবর্তীতে তিনি ভারতের ত্রিপুরার মতিনগরে যান। সেখানে তাঁকে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্বে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দেওয়ানগঞ্জ, ছাতকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
তিনি ছিলেন এমন একজন কমান্ডার, যিনি শুধু মানচিত্রে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন না—প্রয়োজনে নিজেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন।
ছাতকের যুদ্ধ
১৯৭১ সালের ১১ অক্টোবর তাঁর নেতৃত্বে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সিলেটের ছাতক অভিযানে অংশ নেয়।
ছাতক অভিযান শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি।
সামনে অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন পরীক্ষা।
ছোটখেল অভিযান—এক বীরের নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের নভেম্বর।
সিলেটের রাধানগর ও ছোটখেল এলাকা তখন পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত অবস্থান।
মিত্রবাহিনীর গোর্খা সৈন্যদের একটি আক্রমণও সেখানে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছিল।
এমন সময় ছোটখেল মুক্ত করার দায়িত্ব এসে পড়ে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর শাফায়াত জামিলের ওপর।
একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সাধারণত সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন না। কিন্তু শাফায়াত জামিল ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া।
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—
যুদ্ধ হবে সামনে থেকে, আর তিনি থাকবেন যোদ্ধাদের সঙ্গে।
২৭ নভেম্বর গভীর রাতে প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ধানক্ষেত পেরিয়ে এগিয়ে গেলেন পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের দিকে।
সবার সামনে ছিলেন
মেজর শাফায়াত জামিল।
সঙ্গে কোম্পানি কমান্ডার এস আই নূরুন্নবী খান।
অন্ধকার রাত। চারদিকে শত্রুর অবস্থান। মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রতি মুহূর্তে।
তবু থামেননি তাঁরা।
পাকিস্তানি সেনাদের বাংকারের কাছাকাছি পৌঁছে মুক্তিযোদ্ধারা দুই দিক থেকে আক্রমণ শুরু করেন। শুরু হয় প্রচণ্ড গুলিবিনিময়। কয়েকটি বাংকারে গড়ায় সম্মুখ ও হাতাহাতি যুদ্ধ।
কিন্তু সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের থামানোর মতো শক্তি ছিল না পাকিস্তানি বাহিনীর।
মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের তীব্র আক্রমণে ছোটখেল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
শত্রুর বাংকার থেকে উদ্ধার হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পাকিস্তানি বাহিনী অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়।
কিন্তু বিজয়ের সেই মুহূর্তেও যুদ্ধ শেষ হয়নি।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা বিজিত অবস্থান সুদৃঢ় করার কাজে ব্যস্ত। শাফায়াত জামিল নিজে পরিস্থিতি তদারক করছিলেন।
হঠাৎ—
শত্রুর গুলি এসে বিদ্ধ করল তাঁর ডান কোমর।
মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
গুরুতর আহত হয়েও তাঁর মনোবল ভাঙেনি। সহযোদ্ধারা তাঁকে দ্রুত ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে যান।
একজন কমান্ডার তাঁর সৈনিকদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেই বিজয়ের মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল নিজের রক্ত দিয়ে।
স্বাধীনতার পর
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে ১৯৭৪ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অস্থির ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে যায়।
৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি খালেদ মোশাররফের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং শাফায়াত জামিল গ্রেপ্তার হন।
দীর্ঘ সামরিক জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ, যখন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
শেষ অধ্যায়
মুক্তিযুদ্ধের সেই অকুতোভয় সৈনিক, যিনি একদিন নিজের জীবন তুচ্ছ করে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত চলে গেলেন নীরবে।
১১ আগস্ট ২০১২—কর্ণেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রম, মৃত্যুবরণ করেন।
আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ে ১৯৭১-এর সেই উত্তাল সময়ের কথা—
যখন চারদিকে অনিশ্চয়তা,
যখন মৃত্যু ছিল নিত্যসঙ্গী,
যখন স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল বুকের ভেতর,
আর হাতে ছিল সীমিত অস্ত্র—
তবুও কিছু মানুষ বলেছিলেন,
“এই দেশ আমাদের।
এই মাটি আমাদের।
এই দেশকে স্বাধীন করেই ফিরব।”
শাফায়াত জামিল ছিলেন সেই প্রজন্মের একজন সাহসী প্রতিনিধি।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—
দেশপ্রেম শুধু আবেগের নাম নয়;
দেশপ্রেম কখনো কখনো নিজের জীবনকে
দেশের স্বাধীনতার কাছে সমর্পণ করার নাম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা,
বীর সেনানায়ক,
বীর বিক্রম কর্ণেল শাফায়াত জামিলের প্রতি
গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র সালাম।
কর্ণেল শাফায়াত জামিল, বীর বিক্রম
জন্ম: ১ মার্চ ১৯৪০
মৃত্যু: ১১ আগস্ট ২০১২
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য