খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৫২ এএম
ফেসবুকের ভার্চ্যুয়াল জগতের পরিচয় থেকে তৈরি হওয়া একটি প্রেমগাথা যে পরিণতিতে এভাবে রূপ নেবে, তা হয়তো ভাবেনি কেউ। তবে বাস্তবতার নির্মম চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে রাজধানী ঢাকার বছিলার এক বর্বরোচক হত্যাকাণ্ড। অনাকাঙ্ক্ষিত এক পরকীয়া প্রেমের টানাপোড়েন ধামাচাপা দিতে আর স্বামীকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছে ২৪ বছর বয়সী তরুণ সাজ্জাদ হোসেনকে। পরিকল্পিতভাবে ডেকে এনে খুন করার পর লাশ ৯ টুকরা করে কার্টনে ভরে ফেলা হয় দুটি ভিন্ন জেলায়। বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পিবিআই তদন্তে বেরিয়ে এসেছে শিউরে ওঠার মতো নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিহত সাজ্জাদ হোসেন সাভারের হেমায়েতপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর একমাত্র সন্তান ছিলেন। স্থানীয় একটি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে প্রায় এক বছর আগে বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। একটি ভুয়া ফেসবুক আইডির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬)-র সঙ্গে, যিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
দুই মাসের পরিচয়ে তাঁদের মধ্যকার যোগাযোগ প্রেমে রূপ নেয়। তবে পেছনের গল্পটি আরও জটিল। সুমাইয়ার স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশও (২৬) ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী। ২০২৩ সালে পারিবারিকভাবে গোপন রেখে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রোকনুজ্জামান বিভিন্ন সময় স্ত্রীকে মুখ ঢেকে সংবেদনশীল ছবি তুলতে বাধ্য করতেন। ২০২৫ সালের মার্চে স্বামী ছবি চাইলে ভুলবশত সুমাইয়া তা পাঠায় সাজ্জাদের আইডিতে। সেখান থেকে ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা ঘটে বলে সুমাইয়া দাবি করলেও, তদন্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দীন জানান—প্রকৃতপক্ষে সাজ্জাদ ও সুমাইয়ার মধ্যে দুই মাসের গভীর সম্পর্ক এবং অন্তরঙ্গ মুহূর্তের বিনিময় ছিল। বিষয়টি রোকনুজ্জামান জেনে ফেললে পারিবারিক জীবনে প্রচণ্ড উত্তেজনা ও জটিলতার সৃষ্টি হয়।
স্বামীর সন্দেহ নিরসন ও নিজের দায় এড়াতে সুমাইয়া সাজ্জাদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় সম্মতি দেন। পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে ২ এপ্রিল রাতে এক রিকশাচালককে ৫০০ টাকার লোভ দেখিয়ে তাঁর নামে নিবন্ধিত একটি সিম কিনে নেন রোকনুজ্জামান। সেই নম্বর ব্যবহার করে ৩ এপ্রিল ঈদের ছুটিতে মেস ফাঁকা থাকার সুযোগে সাজ্জাদকে বছিলার ১০ তলা ভবনের ৭ম তলার ঘরে আসতে বলেন সুমাইয়া।
সাজ্জাদ মেসে প্রবেশ করা মাত্রই বাথরুমে ওত পেতে থাকা রোকনুজ্জামান পেছন থেকে হামলা চালান। ছুরি দিয়ে মুখে ও পিঠে নির্বিচারে আঘাত করে সাজ্জাদকে নিস্তেজ করে ফেলা হয়। ঘরে জমে থাকা অতিরিক্ত রক্তের কারণে সাজ্জাদের দেহ সহজে বাইরে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে ঠান্ডা মাথায় রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া বাজার থেকে চটের বস্তা, স্কচটেপ এবং বড় কার্টন কিনে আনেন। এরপর নৃশংসভাবে সাজ্জাদের দেহকে ৯ টুকরা করে তিনটি কার্টনে প্যাক করা হয়।
লাশ লুকানোর উদ্দেশ্যে ৪,৫০০ টাকায় একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করেন এই দম্পতি। রাত বাড়লে বছিলা থেকে কার্টনগুলো নিয়ে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার দিকে রওনা দেন তাঁরা। ফেরার পথে একটি কার্টন ফেলে দেওয়া হয় মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানা এলাকার এক নিচু নর্দমায়। অন্য দুটি কার্টন নিয়ে ফেলে আসা হয় কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের মালঞ্চ হাসপাতাল সংলগ্ন ফাঁকা নিচু জমিতে।
পরদিন অর্থাৎ ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে ফেলা কার্টনটি কুকুর ছিঁড়ে ফেললে বেরিয়ে আসে খণ্ডিত মানবদেহের অংশ। খবর পেয়ে পুলিশ ও পিবিআই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশ উদ্ধার করে। প্রায় একই সময় মুন্সিগঞ্জ থেকেও লাশের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, হাড় ও নখের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে খণ্ডিত দেহটি নিখোঁজ সাজ্জাদ হোসেনের।
নিচে এ সংক্রান্ত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| নিহত ব্যক্তি | সাজ্জাদ হোসেন (২৪), মা-বাবার একমাত্র সন্তান |
| প্রধান অভিযুক্তগণ | সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) ও রোকনুজ্জামান পলাশ (২৬) |
| ঘটনাস্থল | বছিলা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা (১০ তলা ভবনের ৭ম তলা) |
| লাশ উদ্ধারের স্থান | কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) ও পদ্মা সেতু উত্তর থানা এলাকা (মুন্সিগঞ্জ) |
| তদন্তকারী সংস্থা | পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা জেলা |
| তদন্ত কর্মকর্তা | জামাল উদ্দীন (পুলিশ পরিদর্শক, পিবিআই) |
| অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ |
| মামলার মোট সাক্ষী | ৪০ জন |
| আসামিদের বর্তমান অবস্থা | কারাগারে বন্দী (বিচার প্রক্রিয়া চলমান) |
| পলায়ন প্রচেষ্টা | জীবননগর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার |
সম্পূর্ণ ঘটনাটি একটি ‘ক্লুলেস’ হত্যাকাণ্ড হিসেবে শুরু হলেও প্রযুক্তিগত তদন্তে সাফল্য পায় পিবিআই। রিকশাচালকের কাছ থেকে কেনা সিমটি ধরে প্রথমে রোকনুজ্জামান ও পরে সুমাইয়ার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিজেদের আড়াল করতে সুমাইয়া নিজের মূল সিমটি ফেনীর গ্রামের বাড়িতে রেখে আসেন, যেন পুলিশ বিভ্রান্ত হয়।
এরপর তিনি জীবননগর হয়ে ভারতে পালানোর উদ্দেশ্যে গাবতলী থেকে বাসে ওঠেন। খবর পেয়ে পিবিআই-এর এক সদস্য ছদ্মবেশে যাত্রী সেজে সেই একই বাসে ওঠেন। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল রাত দেড়টায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর বাসস্ট্যান্ডে নামার পর সুমাইয়াকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে রোকনুজ্জামানকেও আইনের আওতায় আনা হয়।
বর্তমানে ঢাকার আদালতে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। সাজ্জাদের বাবা ইউসুফ আলী অশ্রুসজল চোখে বলেন, “আমার ছেলে খুব ভালো ছিল, ওর কোনো শত্রু ছিল না। আমি শুধু আমার একমাত্র সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই।” ন্যায়বিচারের আশায় আজ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছে এক সন্তানহারা পরিবার।
মন্তব্য